Recent Post

এপোসাইনাম ক্যান্নাবিনাম APOCYNUM CANNABINUM [Apoc]

Apoc মাথা ভার লাগা অনুভূতি, তদ্রা ও দুর্বলতা অথবা ঘুম হলেও ভাল ঘুম হয় না।
Apoc শরীর যেন অলসভাবে চলে, নাড়ী ধীরে ধীরে চলে, অসাড়ে প্রস্রাব হয়।
Apoc উপর পেটে খালি খালি অনুভূতি, সেজন্য দীর্ঘনিশ্বাস নিতে হয়।
Apoc পিপাসা আছে কিন্তু পানি পান করলেই বমি হয়।
Apoc বুকে চাপ অনুভূতি, বুক ধড়ফড়  করে  ও হৃদপিণ্ডের কাছে দূর্বলতা অনুভূত হয়।
Apoc নাড়ী দূর্বল, সবিরাম, অনিয়মিত ও ধীরগতি বিশিষ্ট।

সমস্ত স্রাবনিঃসরণ কমে যায় বিশেষতঃ মূত্র ও ঘাম। সিরাস ঝিল্লীগুলির শোথ- তরুণ ও প্রদাহযুক্ত শোথ। সিরাস মেমব্রেন – মেমব্রেন— পর্দা যা হতে রস বার হয়। শরীরের যে সব যন্ত্র বাইরে থেকে দেখা যায় না যেমন, ফুসফুস, লিভার ইত্যাদি, তাদের বেষ্টন করে রাখে যে পর্দা ও তা থেকে এক প্রকার রস বার হয় ঐ সব যন্ত্রকে পিচ্ছিল ও কর্মক্ষম করে রাখে।

মিউকাস মেমব্রেন — দেহের যে সব দ্বার যেমন, মূত্রপথ, মুখগহ্বর, নাকের ফুটো ইত্যাদি—যা বাইরে হতে দেখা যায় তাদের ভিতরের পর্দা যা থেকে রসক্ষরণ হয়ে স্থানগুলো পিচ্ছিল ও কর্মক্ষম রাখে ।

শোথ — পিপাসা থাকে (এসেটি-এসি); জল খেতে ভাল লাগে না বা বমি হয়ে বের হয়ে যায় (আর্স); বেশীর ভাগই যান্ত্রিক কোন রোগের সাথে যুক্ত থাকে না; টাইফাস; টাইফয়েড, স্কারলেট জ্বর, সিরোসিস্ রোগে, কুইনাইনের অপব্যবহারে প্রযোজ্য।

সিরোসিস – প্রদাহে বা অন্য রোগের উপসর্গে কোন অঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়া। যেমন সিফিলিস বা ম্যালেরিয়ায় ভুগে, পিত্তপাথরী হলে তার দ্বারা পিত্তনালী পথ বন্ধ হয়ে বা পুরাতন মদ্যপায়ীদের মদ্য বিষাক্ততায় ভুগে সিরোসিস অব লিভার হয়। লিভার কোষগুলি নষ্ট হয়ে যায়। সিরোসিস বহুপ্রকারের যথা

১। সি. এ্যালকোহলিক, বহুদিন যাবৎ মদ খেয়ে।

২। সি, এট্রে ফিক- লিভারের আয়তন ছোট হয়ে যায়।

৩। সি, বাইলিয়ারী- পিত্ত সরবরাহ বোধ হয়ে বা পিত্তনালীর প্রদাহে।

৪। সি. কার্ডিয়াক- কনজেষ্টিভ হার্ট ফেইলিওরে লিভারে রক্ত সঞ্চয় হলে।

৫। সি. ফ্যাট- লিভার কোষে মেদ জমলে।

৬। সি. হাইপারট্রোফিক- সংযোগকারী তন্তু (টিস্যু) বেড়ে গিয়ে লিভারের আয়তন বেড়ে যায়।

৭। সি, ইনফ্যানটাইল- শিশুদের প্রোটিন সরবরাহের বিঘ্ন ঘটে অপুষ্টি হয়।

৮। সি. অবষ্ট্রাকটিভ বাইসিয়ারী– কমন বাইল ডাক্ট বা পিত্তনালীতে পাথর জমে বা টিউমার হয়ে ইত্যাদি।

মাথার খুলিতে জল জমার তরুণ রোগে; ব্রহ্মতালু জোড় খায় না। আচ্ছন্ন নিদ্রা, এক চোখে দৃষ্টিলোপ, এক হাত ও এক পায়ে সারাক্ষণ সঞ্চালন (বাঁ হাত ও বাঁ পা- ব্রায়ো); কপালের সামনেটা উঁচু মনে হয়।

যুবতীদের ঋতুবন্ধ, সেইসাথে হাতে পায়ে পেটে ফোলাভাব ও শোথের মত স্ফীতি।

অতিরজঃ- স্রাব অনেক দিন ধরে বা থেমে থেমে।

স্রাব- তরল বা চাপবাধা, বমিবমিভাব, বমি হয়, বুক ধড়ফড়ানি, নড়াচড়ায় নাড়ী দ্রুত ও দুর্বল হয়। জীবনীশক্তি ক্লান্ত ও অবসন্ন, বালিশ হতে মাথা তুললে মূর্চ্ছা আসে।

গর্ভাবস্থায় ছোট ও শুকনো অথবা গভীর ও তরল কাশি (কোনি)।

সম্বন্ধ – এসে-এসিড ও এপিসের সমগুণ, (এপিসে তৃষ্ণা নেই) আর্স, সিঙ্কোনা, ডিজিটের সমগুণ, সমস্তই শোথরোগে। সর্বাঙ্গীন শোথে এপিস, এপোসাই, ডিজি ব্যর্থ হলেও ব্লাটা ওরিয়েন্টালিসে খারাপ অবস্থা আরোগ্য করেছে—Hoynes.

শক্তি-(১x, ৩x,) ৩০, ২০০।

এই ঔষধটি শ্লৈষ্মিক ঝিল্লী সেরাসঝিল্লী থেকে বেশি মাত্রায় রস ক্ষরণ করে এবং কৈশিক ঝিল্লীর উপর কাজ করে শোথ এবং সর্বাঙ্গ শোথ ও চামড়ার উপর কাজ করে প্রচুর ঘাম উৎপন্ন করে। তরুন মস্তক শোথ। এই ঔষধের প্রধান লক্ষণ হল নাড়ী স্পন্দনের দ্রুততা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। সকল প্রকার শোথাবস্থা, উদরী, সর্বাঙ্গীন শোথ, বক্ষশোথ এবং প্রস্রাবের গোলযোগ, বিশেষতঃ অবরূদ্ধ মূত্র ও কষ্টকর প্রস্রাবের ক্ষেত্রে আমাদের শাস্ত্রে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য ঔষধগুলির মধ্যে, এই ঔষধটি অন্যতম একটি। ব্রাইটসডিজিজের ক্ষেত্রে যে সকল পরিপাক সংক্রান্ত উপসর্গ দেখা দেয়। তৎসহ বমি বমিভাব, বমি নিদ্রালুতা, কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই ঔষধটি প্রায়ই কাজে ব্যবহার হয়। এই ঔষধের শোথের বৈশিষ্ট্য হল, প্রচুর পিপাসা এবং পাকাশয়িক গোলযোগ। হৃদপিণ্ডের অনিয়মিত ক্রিয়া। মাইট্র্যাল ও ট্রাইকাসপিড রিগারজিটেশন। মদ খাওয়া হলে তরুণ বিষক্রিয়া। শরীরের সকল স্ফিংটারের শিথিলতা।

মন – উদভ্রান্ত বিষন্ন।

নাক – একসঙ্গে অনেক সময় ধরে হাঁচি। শিশুদের নাক বন্ধ হওয়া। (স্যাম্বুকাস)। পুরাতন নাকের সর্দিজ রোগ তৎসহ নাক বন্ধ হওয়া এবং দুর্বল স্মৃতিশক্তি। অস্বস্থিকর মাথার যন্ত্রণা। খুব সহজেই ঠাণ্ডা লাগে, নাসারন্ধ্রে রক্তাধিক্য এবং খুব সহজেই নাক বন্ধ হয়ে যায়।

পাকস্থলী – বমিবমি ভাব তৎসহ নিদ্রালুতা। হাঁটাচলা করার সময় পিপাসা। অত্যধিক বমি। খাবার বা জল খাওয়া মাত্র বমি। পেটের ভিতর অস্বস্তি, ভারবোধ, অসুস্থ বোধ হয়। বুকে ও পেটের উপর অংশে ভারীবোধ, এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে কষ্ট হয়। (নোবেলিয়া)। পাকস্থলীর ভিতর খালি খালি মনে হয়। পেট বায়ুতে পূর্ণ। উদরী।

মল – জলের মত, মলত্যাগের সময় বায়ু নির্গমন, তৎসহ গুহ্যদ্বারে টাটানি, খাবার পর বৃদ্ধি। মনে হয় গুহ্যদ্বার হাঁ হয়ে রয়েছে এবং মল সরাসরি বার হয়ে গেছে।

প্রস্রাব – প্রস্রাব থলি অত্যন্ত প্রসারিত। ঘোলাটে, উত্তপ্ত প্রস্রাব, তৎসহ গাঢ় শ্লেষ্মাযুক্ত এবং প্রস্রাবনলীতে জ্বলন হয়ে থাকে প্রস্রাবের পরে। প্রস্রাব বার করার জন্য খুবই সামান্য শক্তি থাকে। ফোটা ফোটা করে প্রস্রাব হয়। কষ্টকর প্রস্রাব। বৃক্কের শোথ।

স্ত্রীরোগ রজঃ লোপ, তৎসহ শরীর ফুলে যায়, প্রচুর রজঃস্রাব তৎসহ বমি বমি ভাব, মূর্চ্ছা, জীবনীশক্তির পতনাবস্থা। রজঃনিবৃত্তি কালে রক্তস্রাব। রক্ত বড়ো বড়ো জমাট বেঁধে বেরিয়ে আসে।

শ্বাস-প্রশ্বাস – অল্প সময় ধরে, শুষ্ক কাশি। ছোট ছোট শ্বাস-প্রশ্বাস এবং সন্তোষভাব আসে না। দীর্ঘশ্বাস। পেটের উপরের অংশে ও বুকে চাপবোধ ।

হৃদপিণ্ড – ট্রাইকাসপিড রিগারজিটেশন, দ্রুত এবং ক্ষীণ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, রক্ত চাপ কমে যায়। ঘাড়ের কাছের শিরার স্পন্দন, সর্বাঙ্গীন লালবর্ণ এবং সর্বাঙ্গীন শোথ।

ঘুম – ঘুমের ভিতর অত্যধিক অস্থিরতা এবং সামান্য ঘুম হয়।

কমা-বাড়া -বৃদ্ধি, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায়, ঠাণ্ডা পানীয়ে, খালি গায়ে থাকে।

সম্বন্ধ — এপোসাইনাসের, সক্রিয় বস্তুটি হল সাইম্যারিন, যা নাড়ীর স্পন্দন কমিয়ে থাকে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। ষ্ট্র ফ্যানথাস (হৃদপিণ্ডের মারাত্মক পতনাবস্থা এবং তৎসহ তীব্র প্রজাতির পাকাশয়িক গোলযোগ, শোথ)। এর‌্যালিয়া হিসপিডা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্রাবকারক ঔষধ। শরীরের কোন গহ্বর স্থানের শোথের ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে। এই জাতীয় শোথ মূলতঃ যকৃতে অথবা বৃক্ক যেকোন কারণেই হোক তৎসহ কোষ্ঠকাঠিণ্য। প্রস্রাবে গোলযোগ, বিশেষতঃ শোথের ক্ষেত্রে। এপিস, আর্সেনিক, ডিজিট্যালিস, হেলেবোরাস।

শক্তি — অরিষ্ট (১০ ফোঁটা দিনে তিন বার) এবং মদ খাবার পর তরুন বিষক্রিয়ায় ১ ড্রাম সিদ্ধ করা সার বস্তু চার আউন্স জলের সঙ্গে।

এপিসে’র সহিত তুলনা করিবার পক্ষে ইহা একটি ভাল ঔষধ। এপিসে’ যেসকল রোগ আরোগ্য হয়, তোমরা দেখিবে যে, ইহার লক্ষণগুলি তাহাদের সদৃশ এবং অনেকটা অনুরূপ। শোথ অবস্থা, বাত অবস্থা, কোষময় তন্তুসমূহের স্ফীতি, কোষসমূহের শোথ, শোথের পরিণাম ফলে স্বল্পমূত্র, শোথসংযুক্ত প্রদাহিক স্ফীতি সম্বন্ধে বিচার করিলে তোমরা এই দুই ঔষধের অত্যন্ত সাদৃশ্য দেখিয়া বিস্মিত হইবে। সুতরাং তোমাদিগকে দুইটি রোগী লইয়া আরম্ভ করিতে হইবে এবং তাহাদের বিশেষ বিশেষ লক্ষণগুলি সংগ্রহ করিতে হইবে। যদি একটি লক্ষণও বাদ পড়িয়া যায়, যেমন বৃদ্ধি ও উপশম, শৈত্য বা উত্তাপে প্রীতি, তাহা হইলে তোমরা অনেক ক্ষেত্রেই এপিস’ ও এপোসাইনামের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে পারিবে না, কারণ তাহাদের স্ফীতি, তাহাদের রক্তপাত তাহাদের প্রসারণ এবং তাহাদের উপসর্গগুলি এতই সদৃশ। উভয়ই শোথের ঔষধ, বাধা নিয়মাবলম্বীরা প্রথমে ‘এপিস’ দিয়া পরীক্ষা করিবেন এবং তারপর এপোসাইনাম দিবেন; এবং তারপর হয়ত শোথ সম্বন্ধে উপযোগী আর একটি ঔষধ পরীক্ষা করিবেন।

কিন্তু ঔষধের সর্বত্রই ঠান্ডায় বৃদ্ধি-লক্ষণ আছে, রোগী নিজে ঠান্ডায় খারাপ বোধ করে। তাহার রোগগুলি ঠান্ডা প্রয়োগে বর্ধিত হয়। ফুলা এবং শোথগ্রস্ত অবস্থায়, সে শীতার্ত থাকে, বাতাসে অনুভূতিসম্পন্ন হয়। সে ঠান্ডা পানীয় সহ্য করিতে পারে না। তাহার পাকস্থলীতে বেদনা হয়, এমনকি ঠান্ডা পানীয়ে সে বমি করে। ঠান্ডা পানীয় গ্রহণ করিলে উদরে বেদনা হয়। পাকস্থলীতে ঠান্ডা জিনিষ থাকিলে শরীরের এখানে সেখানে অস্বস্তিবোধ হয়। তোমরা এই মুহূর্তেই দেখিতে পাইতেছ, ইহা ‘এপিস’ হইতে কত পৃথক। কোন ব্যক্তি হয়ত লক্ষণ খুঁজিয়া বেড়ান, কিন্তু রোগীর সহিত সম্বন্ধযুক্ত বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন না; এবং লক্ষণাবলীর সহিত সম্বন্ধযুক্ত উপশম উপচয়ের মধ্যেও পার্থক্য নির্ণয় করেন না; তিনি রোগীবিশেষের সমুদয় লক্ষণ যে উত্তাপে বৃদ্ধি হয় এবং অপর একটি রোগীর সমুদয় লক্ষণ যে উত্তাপে উপশমিত হয় এই বিরাট পার্থক্যটি অনুধাবন করতে পারিবেন না।

সৰ্ব্বপ্রকার স্রাবই কমিয়া যায়। মূত্র অল্প হয়। চৰ্ম্ম শুষ্ক হয়। তাহার যে রোগই হউক, সে ঘামিতে পারে না। সে মনে করে যে, ঘাম হইলেই সে ভাল হইয়া উঠিবে। জল কিছুতেই বহিঃনিঃসৃত হয় না। সে প্রচুর জল পান করে এবং উহা কৌশিক ঝিল্লীতে প্রবেশ করিয়া উহাদিগকে স্ফীত করিয়া তোলে এবং ফলে সে শোথগ্রস্ত হইয়া পড়ে।  তাহার জলীয় ধাতু অর্থাৎ সে এরূপ ব্যক্তি যে জল খায়, কিন্তু তাহা নির্গত করে না। তাহার মূত্র স্বল্প; সে সামান্যমাত্র ঘামে অথবা একেবারেই ঘামে না। তাহার চর্ম শুষ্ক, সময়ে সময়ে উত্তপ্ত, কিন্তু তবুও সে শীতার্ত থাকে। চৰ্ম্ম কর্কশ ও খসখসে বোধ করে, কিন্তু তবু শীতার্ত থাকে। এপিসও শুষ্ক চৰ্ম্ম এবং স্বল্প মূত্র হইতে ভয়ানক কষ্ট পায়, কিন্তু এপিসের সর্বত্রই উত্তাপে বৃদ্ধি ও ঠান্ডায় উপশম হয়। শোথ রোগে, বাতরোগে এবং অন্যান্য আভ্যন্তরিক রোগে ইহাই ঔষধদ্বয়ের মধ্যে প্রধান পার্থক্যসূচক লক্ষণ। “শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীসমূহের শোথ।” মস্তিষ্ক, হৃৎবেষ্ট, ফুসফুস আবরক, অন্ত্রবেষ্টের শোথ এবং ইহাদের প্রত্যেকটিই রক্তাম্বু-প্রসেকহেতু স্ফীত। আর ঐ সঙ্গে অত্যন্ত কষ্ট, অত্যন্ত অস্বচ্ছন্দতা বর্তমান থাকে। প্রদাহিক বাতও আবার ‘এপিস’ সদৃশ; এবং ঐ রোগে ইহার শোথ দেখা দেয়। সন্ধিসমূহের,গুলফসন্ধির, হাতের ও পায়ের আঙ্গলের প্রদাহ দেহের সকল স্থানের সন্ধির প্রদাহ। সন্ধির চারিদিকের ফুলায় ‘এপিসে’র ন্যায় চাপ দিলে গর্ত হইয়া যায়। কিন্তু স্বল্পমূত্রের সহিত ঘর্মহীনতার সহিত, জ্বরাবস্থার সহিত সে সর্বদাই শীতার্ত থাকে এবং আক্রান্ত অঙ্গগুলিতে ভালভাবে কাপড় জড়াইয়া রাখিতে চায়, কিন্তু এপিস’ ঐগুলিকে অনাবৃত রাখিতে চায়। কেহ হয়ত বলিবেন “কেন, উহা ত একটিমাত্র লক্ষণ।” যাহারা রোগীর সমস্ত অনুভূতির বিষয়ে কথিত লক্ষণ এবং অঙ্গবিশেষের সম্বন্ধে কথিত লক্ষণের মধ্যে পার্থক্য দেখিতে পান না তাঁহারা বাকি লক্ষণগুলির ন্যায় উহাকেও একটি মাত্র লক্ষণ বলিবেন। তিনি যখন কোন রোগীকে গ্রহণ করেন এবং রেপার্টরির মধ্যে খুঁজিতে থাকেন তখন উহাকে একটিমাত্র লক্ষণরূপেই গ্রহণ করিবেন। তথাপি ঐ লক্ষণটি সময়ে সময়ে অপর সকল লক্ষণকে অগ্রাহ্য করিয়া দিবে, কারণ উহা রোগীর সর্বাঙ্গীণ অনুভূতি সম্বন্ধীয় লক্ষণ, বিশেষ কোন অঙ্গ সম্বন্ধীয় লক্ষণ নহে। আমাদের অনেকগুলি ঔষধ আছে, যাহাতে রোগী নিজে উত্তাপেই উপশমিত হয়। সে উত্তাপে থাকিতে চায়, সে গরম হইতে চায় কিন্তু তথাপি অঙ্গবিশেষে সে ঠান্ডাই ভালবাসে। কিন্তু যাহা তাহার সর্বাঙ্গীণ লক্ষণ তাহাই প্রধান এবং যদি আমরা সৰ্ব্বাঙ্গীণ লক্ষণ ও স্থানীয় লক্ষণের মধ্যে প্রভেদ না করিতে পারি, তাহা হইলে আমরা মেটিরিয়া মেডিকাকে গুলাইয়া ফেলিব। রোগীর অঙ্গবিশেষ সম্বন্ধীয় লক্ষণ হইতে সৰ্বাঙ্গীণ লক্ষণগুলিকে পৃথক করিয়া লইতেও হইবে। “অত্যন্ত তৃষ্ণার সহিত শোথ।”

টাইফয়েড এবং আরক্ত জ্বরের ন্যায় বিষাক্ত প্রকৃতির রোগের ইহা একটি বড় ঔষধ এবং অনেকদিন স্থায়ী রোগের পক্ষে উপযোগী। রোগী অত্যন্ত অবসন্ন হইয়া পড়ে, অত্যন্ত শীতার্ত, অত্যন্ত নীরক্ত হইয়া পড়ে, তাহার অত্যন্ত তৃষ্ণা থাকে কিন্তু মূত্র অল্প হয় এবং চর্ম শুষ্ক থাকে। ইহা খারাপ প্রকৃতির রোগান্তিক-দুৰ্বলতা;—সে আরোগ্য হয় নাই। শোথ আরম্ভ হয়, আরক্ত জ্বরের পরবর্তী শোথ, টাইফয়েড জ্বরের পরবর্তী শোথ। টাইফয়েড জ্বরের ন্যায় দুষ্ট প্রকৃতির জ্বর তাহাকে চার পাঁচ সপ্তাহ শয্যাগত করিয়া রাখিয়াছে এবং সে জীর্ণ ও অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে কিন্তু এখনও তাহার মাংস পুরিয়া উঠিতেছে না, তাহার কিছুই ক্ষুধা নাই, তবুও সে প্রচুর জল পান করে, মনে হয়, সে জল ছাড়া আর কিছুই চায় না। তাহার চর্ম ফুলিতে থাকে, পূর্ণ হয় এবং শোথগ্রস্ত হয়। ইহা ‘এপিস’ সদৃশ, এবং যদি সে সৰ্ব্বদাই উত্তপ্ত থাকে এবং অনাবৃত হইতে চায় এবং ঠান্ডা জিনিষ চায়, তাহা হইলে ‘এপিস’ই প্রযোজ্য হইবে।

এই ঔষধের মানসিক লক্ষণগুলি প্রকাশিত হয় নাই। আমরা মাত্র কয়েকটি রোগিদেহে পরীক্ষিত লক্ষণ পাই এবং তাহার কোন প্রয়োজনেরই নহে। মস্তকোদক রোগে যে বিশিষ্ট প্রকার অচৈতন্য অবস্থা দেখা যায়, ইহা তাহা আরোগ্য করিয়া থাকে, কিন্তু পরীক্ষার অভাববশতঃ, আমরা বলিতে পারি না যে কি প্রকৃতির মস্তিষ্করোগের প্রাথমিক অবস্থায় ঔষধটি উপযোগী হইবে। উহা অনেকদিন থাকার পর, অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহ চলার পর যে অবস্থা উপস্থিত হয়, আমরা কেবলমাত্র তাহাই জানি;—সে মাথা চালিতে থাকে, এপাশ ওপাশ করিতে থাকে এবং অত্যন্ত শীর্ণ হইয়া পড়ে। এই সঙ্গে শিশুর শীত ও জ্বর থাকে, তাহার মাথার খুলিটি বড় হইতে থাকে, এবং ব্রহ্মরন্ধ্রটি বিস্তৃত হইতে থাকে। এইরূপ অবস্থায়, অবরুদ্ধ কোষের শোথ আরোগ্য করিবার মত যে ঔষধগুলির সম্বন্ধে আমরা চিন্তা করিতে থাকি এবং ইহা সেই সকল ঔষধের একটি। কিন্তু আমরা ইহার আরম্ভ জানি না। আমরা-এপিসে’র আরম্ভ জানি কিন্তু এই ঔষধের জানি না। হ্যানিম্যানের পরীক্ষা বিশেষ লক্ষণগুলিতে পূর্ণ। তিনি তাঁহার পরীক্ষাকারিগণকে ঘুরাইয়া ফিরাইয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন,—তাহাদের কিসে হ্রাস বা বৃদ্ধি হয়, কখন তাহাদের লক্ষণগুলি আরম্ভ হয়, কখন উহাদের শেষ হয়। অনেকগুলি লক্ষণ তিনি নিজেই অনুভব করিয়াছিলেন কারণ তিনি নিজে অনেক ঔষধ পরীক্ষা করিয়াছিলেন। হ্যানিম্যান অনুভূতিপ্রবণ ধাতু ছিলেন, তাহার গভীর উপলব্ধি ছিল এবং পরীক্ষা তাহাকে ঔষধগুলির মধ্যে এরূপ অন্তদৃষ্টি দিয়াছিল যাহা অন্য উপায়ে সম্ভব ছিল না। যাঁহারা উপযুক্তভাবে, মনোযোগের সহিত এবং বিচক্ষণতার সহিত ঔষধ পরীক্ষা করেন, তাহাদের মেটিরিয়া মেডিকা সম্বন্ধে জ্ঞান অন্য সকলের চেয়ে অধিক হয়। তাঁহারা শ্রমসাধ্য ব্যাপারে অভ্যস্ত হন এবং সেইজন্য অনেকদিন বাচেন। তাহারা তাহাদের পরিবেশে, আবহাওয়ায়, সঙ্গী সাথীদের সম্বন্ধে, পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে অধিকতর সহনশীল হন। তাঁহাদের মন অধিকতর ভালভাবে গঠিত হয়, এবং হ্যানিম্যান যেরূপ দেখিয়াছিলেন, তাঁহারাও সেইরূপ দেখিতে পারেন। কিন্তু আজকাল যে পরীক্ষা হয় তাহাতে সাধারণ লক্ষণ যথা পাকস্থলীর বেদনা, বমনেচ্ছা, শিরঃপীড়া, পৃষ্ঠবেদনা,পর্দতল ঠান্ডা হওয়া প্রভৃতি ব্যতীত আর কিছুই লিপিবদ্ধ হয় না। আমাদের অনেকগুলি ঔষধের ইহার চেয়ে আর বেশী পরীক্ষা হয় নাই। কি, কখন, এবং কতখানি তাহা বাদ পড়িয়া আছে। হ্রাস বৃদ্ধি লক্ষণ বাদ পড়িয়া আছে। সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি বর্ণনা করা হয় নাই, কারণ ঐগুলিকে হৃদয়ের আবেগ বলিয়া মনে করা হইয়াছে। লিখিত হইল,“অবসন্ন মন, এবং হতবুদ্ধি। মনে করে যেন সে কাঁদা ভিন্ন। আর কিছুই করিতে পারে না।” কিন্তু আমরা জানিতে পারিলাম না যে উহা পুরুষের পক্ষে, কি স্ত্রীলোকের পক্ষে। আমরা ইচ্ছা বা বিতৃষ্ণা, লক্ষণটি মানসিক কি দৈহিক তাহা জানিতে পারিলাম। সুতরাং এরূপ পরীক্ষাকে আংশিক পরীক্ষা বলা যাইতে পারে এবং ইহা কেবলমাত্র যেসকল রোগ দেহের উপরিভাগে প্রকাশ পায়, তাহাদের পক্ষেই উপযোগী।

“অত্যন্ত অচৈতন্যতার সহিত মস্তকোদক রোগ।” ইহা রোগের শেষ অবস্থা, যে অবস্থায় অত্যন্ত অবসন্নতা, মাংসনাশ, সমস্ত অঙ্গের আড়ষ্টতা, শোথ রোগের ফুলা দেখা দিয়াছে। অনেক সময়ে মস্তকোদকে যন্ত্রণা স্নায়ুসমূহের উপর দিয়া ধাবিত হইয়া সন্ধিগুলিকে আক্রমণ করে। তখন এপিস এবং ক্যাল্ক কাৰ্ব্ব’ এবং এই ঔষধটি অদ্ভুতভাবে রোগের গভীরে প্রবেশ করে। মস্তকোদক রোগে ঔষধটি যে কাৰ্য্য করিতেছে তাহার প্রথম স্থায়ী এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই যে উহা দ্বারা যে প্রস্রাব সৰ্ব্বক্ষণ অত্যন্ত অল্প ছিল তাহারই প্রবাহ বৰ্ধিত হইবে। মস্তকোদক রোগের জন্য টিউবারকুলিনাম অধ্যায় পাঠ করা।

মুখভাব যন্ত্রণাব্যঞ্জক। “মুখমন্ডল স্ফীত, শোথযুক্ত, থমথমে। চক্ষুর নিম্নদেশ স্ফীত । চাপ দিলে উহাতে গর্ত হইয়া যায়। জিহ্বা শুষ্ক, অত্যন্ত তৃষ্ণা।” আর একটি ঔষধ আছে, উহাও এরূপ ক্ষেত্রে উপযোগী হয়, ঐ ঔষধটির সহিত ইহার গোলমাল হইতে পারে, এবং উহা প্রায়ই এই ঔষধের পূর্বে প্রয়োজন হয়। ঔষধটি আর্সেনিক। উহাতে এপিস’ এবং এপোসাইনামের শোথলক্ষণগুলি সবই আছে। উহাতে উদর ও অন্যান্য আবদ্ধকোষের শীতলতা এবং স্ফীতি আছে। উহাতেও উত্তাপে সমস্ত লক্ষণের উপশম হওয়া এবং রোগীর নিজের উপশম বোধ করা আছে, এবং এজন্য যথেষ্ট উত্তাপ প্রয়োজন হয়; সে উত্তপ্ত ঘরে থাকিতে চায় কিন্তু আর্সেনিকে’ আরও কিছু আছে। উহাতে মুমূর্ষুবৎ উৎকণ্ঠা এবং ভয়ানক অস্থিরতা আছে। যাহা অন্য ঔষধ দুইটিতে নাই। উহাতে রোগীর ঘরে প্রবেশ করিলেই এমন বিশ্রী গন্ধ পাওয়া যায়, যেরূপটি অপর দুটি ঔষধের কোনটিতে সাধারণতঃ দেখা যায় না। এইভাবে আমাদিগকে ঔষধগুলিকে দেখিতে হইবে, আমরা তাহাদিগের একটিকে এককালে পাঠ করিব কিন্তু উহাদিগকে তুলনা করিয়াও পড়িতে হয়। যে-সকল ঔষধের সাধারণ লক্ষণ একপ্রকার তাহাদিগের মধ্যে উত্তাপ ও ঠান্ডা সম্বন্ধে তুলনা করিতে হইবে। এইভাবে, আমরা সেইসব ঔষধের একটি তালিকা পাইব, যাহারা ঠান্ডায় উপশম পায়; আবার, আর একটি সেইসব ঔষধের তালিকা পাইব যাহারা উত্তাপে উপশম পায়, এবং তৃতীয় একটি বর্ণনার অনুপযুক্ত, সেইসব ঔষধের তালিকা পাইব যাহারা গরম বা ঠান্ডা কোনটিতেই উপশম পায় না। ইহা প্রারম্ভ মাত্র, পরে উহাদিগকে বিভক্ত, পুনরায় আরও বিভক্ত করিয়া লইতে হইবে।

“গলায় ঘন হলদে শ্লেষ্মা। অত্যন্ত তৃষ্ণা। বক্ষদেশে আড়ষ্টতা। পূর্ণতা। টান টান ভাব।” তোমরা এক মুহূর্তে ভাবিলে দেখিবে যে বক্ষপঞ্জরমধ্যস্থ গহ্বরের শ্লেষ্মাপূর্ণতা বহির্ভাগে অধিক স্ফীতি ঘটাইতে পারে না কারণ পঞ্জরগুলি উহাতে বাধা দেয়। তাহারা দেওয়ালের মত এবং সেই কারণে বৃদ্ধি বা স্ফীতি ফুসফুসের দিকে এবং নিম্নমুখে বক্ষব্যবধায়ক পেশীর দিকেই বিস্তৃত হয়। এইভাবে আমরা কাশির সহিত বৰ্দ্ধিত শ্বাসকৃচ্ছ্রতা পাই। এপিসে’র ন্যায় এই ঔষধের রোগীকেও বসিয়া থাকিতে হয়, সে শুইতে পারে না। তোমরা দেখিবে যে রোগীর বসিয়া থাকিতে বাধ্য হওয়া বক্ষরুদক রোগের একটি সাধারণ লক্ষণ, কারণ শয়ন করিলে ফুসফুসের উপর চাপ বাড়িয়া উঠে এবং নিশ্বাস লইবার স্থানকে সঙ্কীর্ণ করে। এই কারণে সে বসিয়া থাকিতে বাধ্য হয়, যাহাতে তাহার ভারি জলের থলিটি, তাহার পুরার থলিটি বক্ষব্যবধায়ক পেশীর দিকে ঝুলিয়া পড়ে এবং তাহার ফলে উদরে চাপবোধ এবং অন্ত্রাদির স্ফীতি জন্মে। “জাগিয়া উঠিলে তৃষ্ণা, সারাদিনই তৃষ্ণার্ত থাকে; অত্যন্ত তৃষ্ণা কিন্তু জল ভাল লাগে না।” সে শীতল জল চায় কিন্তু উহা পাকস্থলীতে এরূপ বিসদৃশ হয় যে, পাকস্থলীতে বেদনা দেখা দেয়, এবং সে উহা গরম হইবার, পূৰ্বেই বমি করিয়া ফেলে; অথবা পাকস্থলীতে স্ফীতি বা অস্বচ্ছতার সৃষ্টি হওয়ায়, সে ঠান্ডা পানীয় পান করিতে ভয় পায়। সে গরম পানীয়ে অধিকতর শান্তি পায়। গরম পানীয়ে তাহাকে গরম করিয়া তুলে, সে অধিক আরাম পায়; ঠান্ডা পানীয় উপচয় ঘটায়। কিন্তু তথাপি তাহার ঠান্ডা পানীয়ের তৃষ্ণা থাকে।

তারপর পেটফাঁপা ও বমন দেখা যায়। সৰ্ব্বাঙ্গীন শোথের সহিত তুমি কোন কোন রোগীর কোষতন্তুসমূহ এরূপ স্ফীত দেখিবে যে, মনে হইবে আর একটু জলও পাকস্থলী হইতে রক্তে গৃহীত হইতে পারে না। সে পূর্ণ হইয়াই আছে। তাহার রক্তবহা নাড়ীগুলি স্ফীত, তাহার পাকস্থলীটি স্ফীত, সুতরাং তাহাকে বমি করিতেই হইবে; এবং তাহার সর্বশরীরে এইরূপ স্ফীতির সহিত সে জল পান করে এবং বমি করিতে থাকে। সে অতিকষ্টে কিছু খায়, কিন্তু উহা পেটে রাখিতে পারে না, উহা হজম হয় না। উহা হইতেই নিম্নের লক্ষণগুলির কতক উপস্থিত হয়। “উদরোদ্ধ প্রদেশে, বক্ষে চাপবোধ”, সেইজন্য নড়াচড়া করিবার উপযুক্ত দম পাওয়া প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে। সামান্য মাত্র খাদ্যেই যেন তাহার পেট ফুলিয়া উঠে। সে জাগিয়া উঠিয়া কিছু খাইতে চায়। তাহার রাক্ষুসে ক্ষুধা থাকে কিন্তু অতি সামান্য খাদ্য, এমনকি এক গ্রাস খাদ্যেই তাহার পেট যেন ফুলিয়া উঠে। তাহার পাকস্থলী পূৰ্ব্ব হইতে জলে পূর্ণ হইয়া থাকে, সে প্রচুর পরিমাণে জল বমি করে, পিত্ত বমি করে, এবং যাহা খাইয়াছে তাহা অজীর্ণ অবস্থায় বমি করে। শোথ অবস্থাতেই, অবশেষে তাহার পাকস্থলীর উত্তেজনা দেখা দেয়। মনে হয় যেন উহার মধ্য দিয়া আর কিছুই নির্গত হইতেছে না। অবশেষে তাহার অন্ত্রাদির পক্ষাঘাত উপস্থিত হয়। মূত্র গ্রন্থিদ্বয় কাজ করে না এবং কদাচিৎ মূত্র নির্গত হয়। জিহ্বা প্রদাহিত হইয়া উঠে। শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীগুলির সমস্তই এবং সম্ভবতঃ পাকস্থলীও প্রদাহিত হয়। উদরটি অত্যধিক স্ফীতিযুক্ত, উদরের শোথ(উদরী)।

তাহার আর এক অবস্থা উপস্থিত হয়। মনে হয় যেন একে একে প্রত্যেকটি যন্ত্র উহার কাৰ্য্য করিতে বিরত হইতেছে। ডিম্বকোষ এবং জরায়ু তাহাদের কার্য সম্পন্ন করিতে অক্ষম হয় এবং শোথ অবস্থার সহিত রজঃরোধ উপস্থিত হয়। অনেক সময়ে মনে হয় যে, ইহা ঐরূপ উপদ্রবের প্রারম্ভ, প্রথমে যন্ত্রগুলি তাহাদের কাৰ্য্য করিতে বিরত হয়, তারপর শোথ দেখা দেয়। স্ত্রীলোকটি মারাত্মক দুর্বলতা ও স্নায়বিক উত্তেজনার অবস্থায় চলিয়া যায়, তাহার ঋতুপ্রবাহ দেখা দেয় না, উদরের কোমলতা, উদরের স্ফীতি এবং তারপর সর্বাঙ্গে স্ফীতি উপস্থিত হয়।

শোথের সহিত পৰ্য্যায়ক্রমে উদরাময় রোগ এপোসাইনাম দ্বারা আরোগ্য হইয়াছে। সময়ে সময়ে উদরাময় উপস্থিত হইলে অন্য সকল উপদ্রব চলিয়া যায়। উদরাময়ে প্রচুর, হলদে জলবৎ মল অনিচ্ছায় নির্গত হয়। আমি জানি যে, একবার একটি শোথের রোগীকে একমাত্রায় অনেকটা করিয়া ঔষধ দেওয়া হইয়াছিল এবং তাহাতে এই ঔষধের বিশিষ্ট প্রকার উদরাময় দেখা দিয়াছিল। যতদিন উদরাময়টি ছিল, ততদিন রোগীটির বর্ধিত প্লীহা, দেহের শোথ অবস্থা প্রভৃতি সবকিছুরই সাধারণ নিয়মে ডাক্তারের নিকট দৃশ্যতঃ চলিয়া গিয়াছিল। উহা আমার দৃষ্টিতে আসিলে, আমি বলিয়াছিলাম, “আচ্ছা, অপেক্ষা কর।” অবশেষে যেই তাহার এপোসাইনাম বিষাক্ততা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল, অমনি তাহার হৃৎক্রিয়া বন্ধ হইয়া মৃত্যু হইল। এলোপ্যাথিক মতে ‘ডিজিটেলিস’ ব্যবহারেও অনুরূপ অবস্থা দেখা যায়। এমন সময় আসে যে, ডাক্তার ‘ডিজিটেলিস’ বন্ধ করিতে বাধ্য হন এবং রোগীও হার্টফেল করিয়া মারা যায়। এজন্য কখনই ‘ডিজিটেলিস’কে মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় না; এবং ডাক্তার কখনও শিক্ষা করেন না যে, ‘ডিজিটেলিস’ রোগীকে মারিয়া ফেলে।

সৰ্ব্বত্রই, চৰ্ম্মে, মূত্রগ্রন্থিতে, অন্ত্রাদিতে, জরায়ুতে ক্রিয়াবিকৃতি ঘটে এবং সবগুলি যন্ত্রই শোথ জন্মানর প্রবণতা সৃষ্টি করে। মূত্রসম্বন্ধীয় উপদ্ৰবগুলি অত্যন্ত কষ্টদায়ক। প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে অনেক রোগেই স্বল্পমূত্র থাকে। মূত্রাবরোধ, যন্ত্রণাদায়ক মূত্রপাত; অবিরত মূত্র প্রবৃত্তি! মূত্ৰধার সময়ে সময়ে কেবল মাত্র আংশিকভাবে পূর্ণ থাকে, কিন্তু সে মূত্রত্যাগ করিতে পারে না। “মূত্রাবরোধের সহিত অতিশয় মূত্রপ্রবৃত্তি।” “হস্ত-পদাদির পক্ষাঘাত। মূত্রত্যাগের প্রবৃত্তি।” হস্ত-পদাদিতে অসাড়তা, ঝিনঝিন করা এবং পরিশেষে সম্পূর্ণ শক্তিনাশ। কতকগুলি রোগী এই অবস্থায় কিছুকাল থাকে এবং পরিশেষে শোথ দেখা দেয়। আমি পূৰ্ব্বে যেরূপ বলিয়াছি, ইহাতে রোগের পৰ্য্যায়শীলতা আছে। প্রচুর স্রাবের সহিত শোথ পৰ্যায়ক্রমে আসে। অন্ত্র হইতে বহুল স্রাবের দ্বারা অথবা মূত্রপিন্ডের আক্ষেপিক কার্য্যের দ্বারা শোথের উপশম হইতে পারে। এই সময়ে মূত্র এত প্রচুর হয় যে, সে বুঝিতে পারে না, এত জল কোথা হইতে আসিতেছে। অকস্মাৎ এই অবস্থা থামিয়া যায়। মূত্র অল্প হইয়া পড়ে, টিসুগুলি রক্তাম্বুতে পূর্ণ হয় এবং শোথ অবস্থা বর্ধিত হইতে থাকে। এই অবস্থাও কিছুদিন পরে চলিয়া যায় এবং রোগী হার্টফেল করে। “মূত্র কমিয়া সাধারণ অবস্থার এক-তৃতীয়াংশে দাঁড়ায়, কিন্তু মূত্রগ্রন্থি বা মূত্রাধারে কোন যাতন্ত্রা বা অস্বাচ্ছন্দ্য দেখা দেয় না। মূত্রনাশ হয়। মস্তিষ্করোগে মূত্র একেবারেই থাকে না। এক সময়ে ইহা একটি বাধাধরা ঔষধ ছিল এবং শয্যামূত্রের জন্য সকল শিশুকেই দেওয়া হইত এবং যেহেতু উহা দ্বারা বহু শিশু আরোগ্য হইত, সেইহেতু ঔষধটিরও নিশ্চয়ই ঐরূপ লক্ষণ আছে, কিন্তু তাহা হইলেও ঐ লক্ষণটি রোগীদেহে পরীক্ষিত লক্ষণ মাত্র। মূত্রস্থলীর উপর এত সুস্পষ্ট ক্রিয়া দেখিয়া মনে হয় যে, ইহা দ্বারা অসাড়ে মূত্রপাত রোগ আরোগ্য হওয়ায় বিস্ময়কর কিছু নাই। “জননেন্দ্রিয়ের শোথ।”

আমি ঋতুপ্রবাহের অবরোধের কথা, ঋতুলোপের কথা পূৰ্বেই বলিয়াছি, কিন্তু ইহাতে সুস্পষ্ট রক্তস্রাব প্রবণতাও আছে। ইহা যে-কোন স্থানের রক্তস্রাব ঘটাইতে পারে, বিশেষতঃ জরায়ুর। প্রচুর রক্তস্রাব বা ঋতুস্রাব প্রচুর, খুব শীঘ্র শীঘ্র; দীর্ঘকালস্থায়ী হইতে পারে, কিন্তু ইহা অন্য সময়েও জরায়ুর রক্তস্রাব ঘটাইতে পারে। ইহাতে রোগীণির এত প্রচুর রক্তস্রাব হইতে থাকে যে, সে জরায়ুর রক্তস্রাবহেতু নীরক্ত হইয়া পড়ে এবং তারপর দেখা দেয় শোথ। পূর্বেকার চিকিৎসকেরা রক্তস্রাবের পর শোথ দেখা দিলে প্রায়শঃই ‘চায়না’ দিতেন। ইহা এতই উপযোগী ছিল এবং সচরাচর এত উপশম দিত যে, তাহারা কদাচিৎ অন্য ঔষধ ব্যবহার করিতেন। কিন্তু এপোসাইনামও রক্তস্রাবের পর শোথ রোগের একটি ঔষধ। অনেক ক্ষেত্রেই রক্তস্রাবের পর শোথ রোগে ইহার লক্ষণসাদৃশ্য সুন্দরভাবে পাওয়া যাইবে।“দীর্ঘকাল ধরিয়া অতিস্রাব অথবা ছয় সপ্তাহ ব্যাপী জরায়ু হইতে রক্তস্রাব। বড় বড় চাপ হইয়া অথবা সময়ে সময়ে তরল অবস্থায় রক্ত নির্গত হয়। এক বা দুই দিন নিয়মমত স্রাব, তারপর অকস্মাৎ স্রাব এত প্রবল বেগে আরম্ভ হয় যে, রোগিণী আর শয্যা হইতে উঠিতে পারেন না। তিনি স্থির হইয়া শুইয়া থাকিতে বাধ্য হন। “তরল রক্তের সহিত ঝিল্লীর খন্ড বা টুকরা। অতিস্রাব চলিতে থাকে এবং থামিয়া থামিয়া দেখা দেয়।” অর্থাৎ যে পর্যন্ত না রোগিণী অবসন্না হইয়া পড়েন, সে পর্যন্ত স্রাবটি চলিতেই থাকে। ইহা ফসফরাস, ইপিকাক” এবং “পিকেলি’ সদৃশ। প্রায়ই এত বেশী রক্ত নষ্ট হইবার পর জরায়ুর রক্তস্রাব থাকিয়া যায়। এই ঔষধে রক্ত যেরূপ তরল, সেইরূপ তরল রক্ত অন্যান্য যে যে ঔষধে আছে, তাহাতে রোগিণীর গভীর অবসন্নতার অবস্থা উপস্থিত না হওয়া পৰ্য্যন্ত স্রাব থামিবার প্রবণতা আসে না। তখন পূৰ্ব্ব বর্ণিতরূপ শ্বাসকৃচ্ছ্রতা রোগিণীকে শুইতে দেয় না। সাধারণতঃ এই অবস্থা বরুদক হইতে দেখা দেয়। আর ইহাতে যে-সকল রোগী বহুক্ষণ ধরিয়া বসিয়া থাকিতে বাধ্য হয়, তাহাদের ফুসফুসে অধঃপাতিত রক্তসঞ্চয় দেখা যায়, ফলে ফুসফুসটি নিম্নদিক হইতে পূর্ণ হয় এবং ঐ পূর্ণতা ক্রমশঃ উপর দিকে উঠিয়া, নিঃশ্বাস লইবার স্থানের অনেকখানি নষ্ট করিয়া ফেলে। “উদরোর্দ্ধ প্রদেশে অত্যন্ত চাপধরা। কষ্টকর শ্বাসক্রিয়া। নিঃশ্বাসের জন্য হাঁপাইয়া উঠে। সাঁই সাঁই করে, কাশে।” ‘টার্টার এমিটিকে যেরূপ ঘড়ঘড়ানি দেখা যায়, ইহাতেও তদ্রূপ হয় এবং টার্টার এমিটিকেও একই রূপ বক্ষের পূর্ণতা থাকে এবং রোগী শুইতে পারে না।

নাড়ী ক্ষুদ্র এবং অনিয়মিত, প্রায় নাড়ীবিহীন। বালিশ হইতে মাথা তুলিতে গেলেই মূর্চ্ছার মত হয়। নাড়ী ক্ষুদ্র ও দুর্বল। হৃৎবেষ্টের শোথ। হৃৎস্পন্দন অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

অপর নাম – ক্যানাডিয়ান হেম্প (Canadian Hemp.)

অ্যাপোসাইনেসী জাতীয় উদ্ভিদ। এর সরস মূল থেকে মূল অরিষ্ট তৈরী হয়। এর উপক্ষারের নাম অ্যাপোসাহনিন (Apocynin)।

শোথ রোগে প্রবল পিপাসা, কিন্তু জল মোটেই সহ্য হয় না, বরং জলপানে বেদনা জন্মে অথবা তৎক্ষণাৎ বমি হয়ে যায়; পাকস্থলী গহ্বরে নিমগ্নতা (sinking) অনুভব (শোথ রোগ)।

 

 

 

 

About The Author

M.D (AMCC, Kolkata, India) M.M (B.M.E.B) D.H.M.S (B.H.B)

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *