Recent Post

আর্জেন্টাম মেটালিকাম ARGENTUM METALLICUM [Arg-m]

Arg-m উপাস্থিতে রস জমে স্থানে স্থানে কঠিন গুটলে হয়, নাক ও কানের উপাস্থি পুরু হয়ে যায়।
Arg-m শরীরের নানা স্থানে ক্ষত, উপাস্থিতে ক্ষত, ক্ষত হতে প্রচুর রস ঝরে, ক্ষতের উৎপত্তি স্থানে রস জমে শক্ত হয়ে যায়।
Arg-m সকল স্রাবের বর্ণ ছাইয়ের মত, ধুসর বর্ণ, ঘন ও চটচটে।
Arg-m  

লকাতে শরীরের স্থানে স্থানে রক্ত বাহির করে ফেলে।

Arg-m দুপুরে ঠিক একই সময়ে ব্যথা সহ বোগের বহু উপসর্গ উপস্থিত হয়।
Arg-m চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে বুক ধড়ফড় করে।
Arg-m চুপচাপ বসে থাকলে পিঠ ও শরীরের বেদনা বৃদ্ধি হয় কিন্তু বেড়ালে উপশম।
Arg-m বোগীর গরম ভাল লাগে ও গরমে উপশম।

উপযোগিতা — লম্বা, পাতলা ও খিটখিটে লোকের ক্ষেত্রে।

পারদ অপব্যবহারের কুফলে।

হস্তমৈথুনের ধাতুগত কুফলে।

চোখের মণির ভিতরে, কানের, নাকের, ইউষ্টেসিয়ান নলের কার্টিলেজ আক্রান্ত হয় না, বা সন্ধিগুলির ভেতরের গঠনপ্রণালীকে আক্রমণ করে।

কার্টিলেজ – হাড় নয় অথচ শক্ত প্ল্যাস্টিক সংযোগকারী তন্তু যা শরীরের বিভিন্ন অংশের চাপ বা ভার বইতে সক্ষম। সদ্যোজাত বা গর্ভাবস্থায় শিশুদের যখন হাড়ে ক্যালসিয়াম পুষ্ট হয় না তখন ইহা হাড়ের কাজ করে। এর নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র বা রক্তসরবরাহ নাই। বড়দের শরীরের কঙ্কালে এর অস্তিত্ব দেখা যায় যেমন বুকের খাচায় রিবগুলিতে কষ্টাল কার্টিলেজ; নাকের দুই ফুটোর মাঝে পর্দা বা ন্যাসাল সেপটাম; কানের বাইরের গঠনে; কানের ইউস্টেসিয়ান নলের বহিরাংশে; ল্যারিংস ও ট্রেকিয়ার আবরণী; মেরুদন্ডে দুই হাড়ের মাঝের অংশ ইত্যাদি।

ইউষ্টেসিয়ান টিউব – কানের শ্রবণযন্ত্র যা কানের মাঝ অংশ থেকে ফ্যারিঙ্কস্ অবধি ৩ থেকে ৪ সে. মি. লম্বা। মিউকাস মেমব্রেনে ঢাকা থাকে। যা হলে ওটিটিস্ মেডিয়া বা মধ্যবর্তী কানের প্রদাহ হয়।

স্বপ্নদোষ – হস্তমৈথুন করলে, প্রায় প্রতি রাতে, লিঙ্গ ওঠে না—লিঙ্গ শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়।

অন্ডকোষে পিষে ফেলার মত যন্ত্রণা (রডো)। জরায়ুর প্রোলান্স (বের হয়ে আসে,) সেইসাথে বা ডিম্বাধানে ও পিঠে ব্যথা। ঐ ব্যথা সামনে ও নীচে বিস্তৃত হয় (ডান ডিম্বাধানে-প্যালেডি), রজঃলোপ কালে রক্তস্রাব।

সর্দি – তরল সাথে হাঁচি-সর্দি দুর্বলতা আনে।

স্বরভঙ্গ – পেশাদার গায়ক ও বক্তাদের (এলুমিনা, অরাম-ট্রি)।

স্বরলোপ – সম্পূর্ণ স্বরলোপ পেশাদার গায়কদের।

গিলতে ও কাশ দিলে গলায় ও স্বরযন্ত্রে হেজে গেছে এরূপ অনুভূতি ও ঘায়ের মত ব্যথা। হাসিতে কাশির উপক্রম (ড্রসেরা, ফস্, ষ্ট্যানাম) ও স্বরযন্ত্রে অনেক শ্লেষ্মা জন্মে।

উঁচু স্বরে পড়াশোনা করলে গলা খেঁকারি দিতে হয় ও খকখক করে কাশতে হয়, কাশিতে সহজেই সাদা চটচটে আঠার মত শ্লেষা উঠে আসে।

বুকে ভীষণ দুর্বলতা (ষ্ট্যানাম); বাঁদিকে বেশী।

গায়ক ও বক্তাদের স্বরের পরিবর্তন (অরাম-ট্রি)।

স্বরযন্ত্র যেখানে দুই শাখায় বিভক্ত সেখানে হেজে গেছে মনে হয়।

বাড়ে — (গায়কদের) স্বর চালনায়, কথা বললে, গান করলে।

সম্বন্ধ – এলুমিনার পরে ভাল খাটে।

হাসলে কাশি শুরু—এ লক্ষণে ষ্ট্যানামের সমগুণ।

বৃদ্ধি — গাড়ী চড়লে (কক্কুলাস), স্পর্শ করলে বা চাপ দিলে; কথা বলায়, গানে, উঁচুস্বরে পড়াশোনা করলে।

শক্তি – ২০০ হতে উচ্চশক্তি।

শীর্ণতা, ক্রমশঃ শরীর শুকিয়ে যাওয়া, বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের ইচ্ছা, শ্বাসকষ্ট, প্রসারণের অনুভূতি, বামদিকের যন্ত্রণা প্রভৃতি লক্ষণগুলি এই ঔষধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ। এই ঔষধের প্রধানকাজ সন্ধিস্থল ও সন্ধিস্থানের সহযোগী বস্তুসমূহ যথা অস্থি, তরুনাস্থি, লিগ্যামেন্টস্ প্রভৃতির উপর কেন্দ্রীভূত হয়। এইসব স্থানের ছোট ছোট রক্তবহানলীগুলি শুকিয়ে যায় অথবা বন্ধ হয়ে যায় এবং এর ফলে অস্থিক্ষত দেখা দেয়। এই অস্থিক্ষত খুবই ধীরে ধীরে, গোপনে এসে উপস্থিত হয় এবং ক্রমশঃ বর্ধনশীল থাকে। এই ঔষধের আর একটি বিশেষ কর্মকেন্দ্র হল, কণ্ঠনলী।

মন – ব্যস্তভাব, সময় খুবই ধীরে বয়, বিষন্নতা।

মাথা – মাথার বামদিকে, থেকে থেকে অস্বস্তিকর স্নায়ুশূল, ক্রমশঃ যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় এবং হঠাৎ করে যন্ত্রণা কমে যায়। মাথার চামড়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মাথাঘোরা, তৎসহ মাতালের মত অনুভূতি, প্রবহমান জলের দিকে তাকালেই মাথাঘোরা। মাথা শূন্য, ফাঁপা বলে মনে হয়। চোখের পাতাগুলি লাল এবং পুরু। ক্লান্তিকর বা দুর্বলকর সর্দি, তৎসহ হাঁচি। মুখ মণ্ডলের অস্থিতে বেদনা। বাম চোখ ও ফ্রন্টাল এমিন্যান্সের মধ্যবর্তীস্থানে যন্ত্রনা।

গলা – হাজাকর, বেদনাদায়ক, ধূসরবৰ্ণ-বিশিষ্ট, জেলির মত শ্লেষ্মাযুক্ত এবং কাশির সময় গলায় টাটানি ব্যথা। সকালের দিকে প্রচুর এবং খুব সহজেই শ্লেষ্মা উঠে।

শ্বাস-প্রশ্বাস – স্বরভঙ্গ সহ স্বরলোপ। কাশির সময় গলার ভিতর হেজে যাওয়ার ন্যায়, টাটানি ব্যথা অনুভূত হয়। পেশাগত সঙ্গীত শিল্পীর কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ লোপ। কণ্ঠনলী মনে হয় হেজে গেছে এবং টাটানি ব্যথা থাকে। খুব সহজেই শ্লেম্মা নির্গত হয়, শ্লেষ্মা দেখতে অনেকটা সিদ্ধ করা বার্লির মত। সুপ্রাস্টারন্যাল ফসার কাছে, একটি ছোটস্থানে টাটানি ব্যথা অনুভূত হয়। কথা বলার সময় ব্যথা বৃদ্ধি পায়। হাসির সময় কাশি। দুপুরের দিকে ঘুষঘুষে জ্বর। জোরে জোরে পড়ার সময় অবশ্যই গলা খাঁকারি দিতে হয়। বুকের ভিতর প্রচণ্ড দুর্বলতা অনুভূত হয়, বামদিকে বেশী হয়। পরিবর্তনশীল কণ্ঠস্বর। বামদিকের নীচের পাঁজরার অস্থিস্থানে বেদনা।

পিঠ – পিঠে তীব্র যন্ত্রণা, চলার সময় ঝুঁকে চলতে হয়, তৎসহ বুকের ভিতর চাপবোধ।

প্রস্রাব – প্রস্রাবের পরিমানের বৃদ্ধি। প্রস্রাব প্রচুর, ঘোলাটে, মিষ্টি গন্ধযুক্ত। বারে বারে প্রস্রাব। প্রচুর প্রস্রাব।  অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ – সন্ধিস্থানে বাতরোগ, বিশেষতঃ কনুই ও হাঁটুর সন্ধিতে। পা দুর্বল এবং কাপে, নীচের দিকে নামার সময় বৃদ্ধি। অসাড়ে হাতের আঙ্গুলের সঙ্কোচন, নিম্নবাহুর আংশিক পক্ষাঘাত, লেখকদের হাতে খিল ধরা। গোড়ালির স্ফীতি।

পুরুষের রোগ — অণ্ডদ্বয়ে র্থেৎলিয়ে যাওয়ার মত বেদনা। যৌন উত্তেজনা ছাড়াই বীর্যপাত। বারে বারে প্রস্রাব তৎসহ জ্বালা।

স্ত্রীরোগ ডিম্বাশয় বড়ো হয়েছে বলে মনে হয়। নীচের দিকে ঠেলা মারার মত বেদনা। জরায়ুর স্থানচ্যুতি। ক্ষয়প্রাপ্ত এবং স্পঞ্জের মত সার্ভিক্স। প্রদরস্রাব দূর্গন্ধযুক্ত এবং হাজাকর। জরায়ুর ক্যানসার জাতীয় অর্বদে উপশমদায়ক। বামদিকের ডিম্বাশয়ে বেদনা। রজোনিবৃত্তি কালে রক্তস্রাব। সমগ্র পেটে টাটানি ব্যথা, ঝাঁকুনিতে ব্যথা বৃদ্ধি পায়। জরায়ুর রোগ তৎসহ সন্ধিস্থানে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বেদনা।

কমা-বাড়া-বৃদ্ধি – স্পর্শে, দুপরের দিকে।

উপশম – মুক্ত বাতাসে, রাত্রিতে শুয়ে পড়ার পর কাশি কমে (হায়োসায়ামাসের বিপরীত)।

সম্বন্ধ – দোষঘ্ন – মার্কিউরিয়াস, পালস।

তুলনীয় — সেলেন, এলাম, প্ল্যাটিনা, স্ট্যানাম, এম্পেলোপসিস (গণ্ডমালা ঋতুগ্রস্ত পুরাতন স্বরভঙ্গের রোগী)।

শক্তি – ৬ষ্ঠ বিচূর্ণ এবং অধিক। খুব তাড়াতাড়ি পুণঃপ্রয়োগ করা যাবে না।

আমরা রৌপ্য ধাতু সম্বন্ধে আলোচনা আরম্ভ করিতেছি। ইহা যে একটি গভীরভাবে কাৰ্য্যকরী ঔষধ, তাহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই, কারণ সমস্ত ইতিহাস ব্যাপিয়া ইহা প্রতীক এবং ঔষধরূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে। সকল ইতিহাসেই ইহাকে মূল্যবান পদার্থ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা একটি এন্টিসোরিক ঔষধ; এবং লক্ষণসমূহ হইতে আমি মনে করি ইহা এন্টিসাইকোটিকও বটে। ইহা জীবনের গভীর অংশে প্রবেশ করে। ইহা বিশেষভাবে স্নায়ু ও স্নায়ুকোষসমূহকে আক্রমণ করে। ইহার রোগগুলি স্নায়ুপথে বিস্তৃত হয়। দেহের সমস্ত উপস্থিগুলি ইহা দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইহাতে উপস্থিগুলির অতিবৃদ্ধি ঘটায়; সন্ধির উপাস্থিময় অংশের, কর্ণের এবং নাসিকার উপস্থিগুলিকে পুরু করিয়া তুলে। উপস্থির বৃদ্ধি ও অৰ্ব্বদ উৎপন্ন করে, রস-প্রসেক ঘটায়। ইহা স্নায়ুপদার্থকে আক্রমণ করে; ইহা একটি গভীরক্রিয় যন্ত্রসম্বন্ধীয়। ঔষধ। ইহা সাধারণ ঔষধ অপেক্ষা বড়, কারণ ইহা মানুষ বলিতে যাহা কিছু বুঝায়, তাহার সবই আক্রমণ করে। যে-সকল স্নায়ুতন্তু বার্তা বহন করে ইহা তাহাদের উপর বিশেষভাবে ক্রিয়া করে। ইহা মস্তিষ্ককে এরূপ গভীরভাবে আক্রমণ করে যে, উহার পরিবর্তন ঘটে এবং ক্রমিক কোমলতার সৃষ্টি হয়। মানুষের উপর ইহার সাধারণ ক্রিয়া সম্বন্ধে একটি অদ্ভুত লক্ষণ এই যে, ইহা প্রধানতঃ বুদ্ধিবৃত্তিকেই বাছিয়া লয়। ইহা তাহার শরীরবিধানকে সামান্যই বিচলিত করে, কেবলমাত্র গতিবিধায়ক তন্ত্রকে অনির্দিষ্টভাবে ও সামান্যমাত্র পরিবর্তিত করে। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধীয় অংশ, তাহার স্মৃতিশক্তি বিশেষভাবে উপদ্রুত হইয়া জড়তাপ্রাপ্ত হয়। ইহা যন্ত্রণায় পূর্ণ এবং যন্ত্রণা ভোগকালে, ইহা রোগীর বিচারশক্তিকে নষ্ট করিয়া ফেলে। প্রায় সকল প্রকার শিরঃপীড়ায় এবং পৃষ্ঠবেদনায় এবং শরীরের উপর ইহা যে বিদীর্ণকর, ছিন্নকর যন্ত্রণা উৎপাদন করে, তাহাতে,—ইহা স্মৃতিশক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে বিচলিত করিয়া ফেলে। তাহার চিন্তাশক্তিকে উপদ্রুত করে। এবং ইহার আক্রমণটি হয় তাহাদের উপর, যাহারা বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে পরিশ্রম করিতে অভ্যস্ত। ব্যবসায়ী, ছাত্র, পাঠক এবং ভাবুকগণ। বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি এরূপ অবস্থায় উপনীত হন যে, আর বিচার করিতে পারেন না, সামান্য মানসিক পরিশ্রমেই তাহার শিরোঘূর্ণন দেখা দেয়। তিনি ক্লান্ত হইয়া পড়েন। সমস্ত লক্ষণগুলিই নিদ্রার পর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সমস্ত দিনের মত বিশ্রান্ত হইবার পরিবর্তে, তিনি মানসিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা লইয়া জাগিয়া উঠেন, সেইজন্য তাঁহার নড়িতে কষ্ট হয়; এবং বহুকষ্টে নিজেকে সংযত করিয়া পরদিনের মানসিক বা শারীরিক পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত করিয়া তুলেন। যদি তিনি বেশীকিছু মানসিক পরিশ্রম করিতে চেষ্টা করেন, তাহা হইলে তাহার শিরঃপীড়া উপস্থিত হয়। শিরঃপীড়া প্রায়শঃই মাথার সম্মুখদিকে, কিন্তু কখন কখন পশ্চাদ্দিকেও হয়।

ইহার আর একটি অদ্ভুত লক্ষণ ইহা- স্নায়ুপথে বিশেষতঃ নিম্ন অঙ্গগুলিতে বিদীর্ণকর, ছিন্নকর বেদনা উৎপন্ন করে। ছিন্নকর বেদনা, যেন স্নায়ুগুলি বিশ্রামের সময় ছিঁড়িয়া টুকরা টুকরা হইয়া যাইবে। ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, ঝটিকাময় আবহাওয়ায় বাত দেখা দিবে, উহাতে সেরূপ ফুলা থাকিবে না, যদিও ইহাতে ফুলাও আছে, কিন্তু উপস্থিগুলির উপর সুস্পষ্ট বেদনা, স্নায়ুপথে বেদনা দেখা দিবে। এই বেদনা এতই তীব্র যে, সে স্থির থাকতে পারে না। অতএব ইহাতে ঠান্ডায়, ভিজা আবহাওয়ায়, ঠান্ডা লাগায় সন্ধিস্থানের ও পেশীসমূহের বাত দেখা দেয় এবং তাহাতে রোগীকে ক্রমাগত হাঁটিয়া বেড়াইতে বাধ্য করে। অনেক লক্ষণ সঞ্চালনে উপশমিত হয়, বিশেষতঃ ভ্রমণে সে অত্যন্ত ক্লান্ত এবং অবসন্ন, কিন্তু তাহার বেদনা এত তীব্র যে, তাহাকে হাঁটিয়া বেড়াইতে বাধ্য করে। এই সকল বেদনা অনেক সময় প্রচুর কফি পানে কমিয়া যায়, কিন্তু উহা দ্বারা রোগ চাপা পড়ে মাত্র। পরে তাহার উপর এত রকমের কষ্ট আসিয়া পড়ে যে, উহার চাপে তাহার স্বাস্থ্যভঙ্গের উপক্রম হয় এবং কালে সে প্রায় অকর্মণ্য হইয়া পড়ে। “মানসিক দুর্বলতা। শারীরিক অবসন্নতা।” বিদীর্ণকর, ছিন্নকর বেদনা। সন্ধিসমূহের, সন্ধিস্থানের উপস্থিসমূহের রোগ। হাড়ের উপর দিয়া ছিন্নকর বেদনা; এবং সে যুবা হইলেও, বাস্তবিক একটি জরাজীর্ণ লোক, একটি পুরাতন ভগ্নস্বাস্থ্য ব্যক্তি। “চল্লিশ বৎসরের একজন লোক যেন একজন আশি বৎসর বয়সের বৃদ্ধ।” তাহার সমস্ত যন্ত্রণাই সঞ্চালনে উপশম প্রাপ্ত হয়।

তারপর ইহাতে যথেষ্ট রসপ্রসেক আছে। প্রদাহিত উপস্থিগুলিতে রস-সঞ্চার হয় এবং শক্ত শক্ত ডেলা জন্মে। উপাস্থিসমূহের পেশীসমূহের অতি বৃদ্ধি, সেইজন্য সন্ধির চারিদিকের উপস্থিগুলি পুরু হইয়া উঠে। কানের ও নাকের উপস্থিগুলি পুরু হয়। চৰ্ম্মের কর্কটরোগে যেরূপ রস-প্রসেক হয়; ইহাও তদ্রুপ। ইহা সৌত্রিক অর্বুদ এবং চৰ্ম্মের কর্কটরোগে আশ্চর্য উপশমদায়ক হইয়াছে। ইহা চৰ্ম্মের কর্কটরোগ আরোগ্য করিয়াছিল।

সৰ্ব্বত্র ক্ষত জন্মে, কিন্তু ক্ষতগুলির আরম্ভ হয় উপস্থি পেশীতে এবং উহা কৌশিক পেশী পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং প্রচুর স্রাব হইতে থাকে। ক্ষতগুলির তলদেশে রস-প্রসেক হয় এবং উহা কঠিন হইয়া উঠে।

ইহার আর একটি বৈশিষ্ট্য যে, উহা উভয় অন্ডই আক্রমণ করে, কিন্তু প্রধানতঃ ডান অন্ডটির উপরেই ইহার বিশেষ ক্রিয়া। বাম ডিম্বকোষ এবং দক্ষিণ অন্ড। ইহা একটি অদ্ভুত ব্যাপার যে, পুরুষ জাতির উপর উহার ক্রিয়া প্রকাশ পায় শরীরের একদিকে এবং স্ত্রীজাতির উপর ক্রিয়া প্রকাশ পায় ঠিক তার বিপরীত দিকে।

ইহা সর্বপ্রকার অর্বুদ ডিম্বকোষের বৃদ্ধি এবং তন্তুসমূহের রস-প্রসেক অবস্থা আরোগ্য করিয়া থাকে। ইহা শীতার্ত ব্যক্তিগণের ঔষধ। রোগী গরমে থাকিতে চায়, গরমে তাহার যন্ত্রণার উপশম হয়। ইহার শিরঃপীড়া উত্তাপে উপশমিত হয়, চাপে উপশমিত হয়, কাপড় জড়াইয়া রাখিলে উপশমিত হয়। রোগীর মাথায় কাপড় জড়াইয়া রাখিয়া আমি অনেক ক্ষেত্রে মাথার যন্ত্রণার লক্ষণ আরোগ্য করিয়াছি।

এক্ষণে যাহাদের জৈব উত্তাপ কম, সেই সব ব্যক্তিকে আমি এই ঔষধের রোগী বলিয়া বিশেষ শ্রেণীতে বিভক্ত করিতেছি। সে গরমে থাকিতে চায়। সম্ভবতঃ সে রোগা, ক্রমেই রোগা হইতে থাকে, ক্রমেই স্নায়বিক হইতে থাকে, ক্রমেই অত্যনুভূতিযুক্ত হইতে থাকে। নানারূপ খেয়াল বিশিষ্ট হয়। যে-সকল স্ত্রীলোকের রৌপ্যধাতুর প্রয়োজন, তাহারা তাহাদের স্নায়বিক অবস্থায় (আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম’ তুলনা কর) এরূপ অদ্ভুত ও ব্যাখ্যার আরোগ্য কাৰ্য্য করে যে, তাহাতে তাহাদের বন্ধুগণের সমস্ত সহানুভূতি চলিয়া যায় এবং লোকে তাহাদিগকে হিষ্টিরিয়াগ্রস্তা বলে। স্নায়ুমন্ডলের গভীরে রোগ। ক্রমশঃ পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে অধিকতর স্নায়বীয় হইয়া উঠে।

এইবার আর্জেন্টাম মেটের মানসিক অবস্থা- মাথা গোলাইয়া গেলে যেরূপ হয় ঠিক সেইরূপ, আবেগ, উচ্ছ্বাস দেখা দিলে যেরূপ হয় ঠিক সেইরূপ ভয়, ক্রোধ, ভয় পাওয়া হইতে, মানসিক সামঞ্জস্য নষ্ট হইলে যেরূপ হয় ঠিক সেইরূপ। ইহার কারণ, রোগী তাহার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে অত্যনুভূতি বিশিষ্ট হয় এবং বিরক্ত করিলে অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়ে। বেদনা উপস্থিত হইলে সে প্রলাপ বকিতে থাকে। ইহা আমরা দুষ্ট প্রকৃতির জ্বরে যেরূপ দেখি, সেইরূপ প্রলাপ নহে, সে আবোল-তাবোল বকিতে থাকে এবং ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে। তাহার মানসিক উত্তেজনা এবং রাগ দেখা দেয় এবং এরূপ অবস্থায় সে অত্যন্ত দ্রুততার সহিত অসংলগ্ন চিৎকার করিতে থাকে। কখন কখন তাহার কথাবার্তার মধ্যেও অস্বাভাবিক উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সব কিছুই তাহার চিন্তার প্রকৃতির সহিত মিশিয়া থাকে। এই সমস্ত সময়ে তাহাকে মাতালের মত দেখায়, সে এক কথা বলিতে বলিতে আর এক কথায় চলিয়া যায় এবং বাচালতা প্রকাশ করিতে থাকে। একই মুহূর্তে তাহার মন অত্যন্ত প্রখর ও সক্রিয় হইয়া উঠে এবং তারপর যাহা বলিতে ছিল সমস্তই ভুলিয়া যায়।

“লোক-সমাজে কথা বলিতে অপ্রবৃত্তি।” কারণ সে উহার আরোগ্য। তাহার মন ক্লান্ত এবং সে যে কি কহিতেছিল, তাহা ভুলিয়া যায়। তাহার কথার সূত্র হারাইয়া ফেলে এবং সে কথা কহিতে ভয় পায়; কারণ, কথা বলিলে তাহার উপসর্গ জন্মে। যদি সে উত্তর দিতে বাধ্য হয়, তাহার মাথা ঘুরিতে থাকে, তাহার সর্বাঙ্গে অদ্ভুত অনুভূতি হয় এবং স্নায়বিক কম্পন বা সঙ্ঘাত দেখা দেয়। ক্লান্ত হইলে তাহার উপর দিয়া বিদ্যুৎ তরঙ্গের ন্যায় আঘাত জন্মে। এরূপ অবস্থা হঠাৎ উপস্থিত হয়, কিন্তু ঠিক নিদ্রা যাইবার সময়েই উহার উপস্থিত হইবার সুসময়। সে মনে করে যে, তাহার সমস্ত দিনের গোলযোগ দূর হইয়াছে এবং এখন সে বিশ্রাম করিতে পারে এবং যে মুহূর্তে তাহার নিদ্রা আসে, অমনি পা হইতে মাথা পর্যন্ত একটি আকস্মিক প্রবাহ দেখা দিয়া তাহাকে জাগাইয়া তুলে, তারপর আর একটি, তারপর আর একটি সময়ে সময়ে সারারাত্রি ধরিয়া তাহার পা হইতে মাথা পর্যন্ত ঝুঁকি লাগে এবং মোচড়ায়। তারপর সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া পড়ে এবং বেড়াইতে থাকে,—বেড়াইয়া উহাকে দূর করিতে চায়। এই লক্ষণ ‘আর্জেন্টাম নাইট্রিকামে’র পরীক্ষায় প্রকাশিত হইয়াছে, কিন্তু আর্জেন্টাম মেটেও সমভাবে আছে এবং আর্জেন্টাম মেট উহা বহুবার আরোগ্য করিয়াছে। হ্যানিম্যান তাহার বর্ণনায় নিদ্রা যাইবার সময়ের প্রবাহগুলির উপর জোর দিয়াছেন; উহা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ঝুঁকি দেওয়া কিন্তু ইহা বৈদ্যুতিক আঘাত, যাহাতে সমস্ত দেহটিকে উৎক্ষিপ্ত করে। “সে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে উৎকণ্ঠিত। মনে করে নিশ্চয়ই তাহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হইতেছে। কারণ সে ক্রমশঃ দুৰ্বল হইতে থাকে। যদিও সে বৰ্দ্ধিতভাবে অস্থির হইতে থাকে, তবু সে হাঁটিতে পারে না। সে বিনা কষ্টে শারীরিক অথবা মানসিক শ্রম করিতে পারে না। চিন্তা করিলে অথবা গরম ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র তাহার মাথা ঘুরিতে থাকে। মস্তকের রোগে এবং জ্ঞানকেন্দ্রের রোগে ইহা একটি ব্যতিক্রম; কারণ, সে সাধারণতঃ ঠান্ডাতেই কাতর হয়। তাহার বাড়ীতে যখন দরজা জানালা বন্ধ থাকে, তখন তাহার মাথা ঘুরায়।

এই ঔষধ সম্বন্ধে একটি বিস্ময়ের বিষয় এই যে, ঠিক দুপুরের সময় অনেকগুলি উপদ্রব, বেদনা এবং কামড়ানি দেখা দেয়। শীত । শিরঃপীড়া। দুপুরবেলাতেই ডিম্বকোষের বেদনা। মাতালের ন্যায় শিরোঘূর্ণন ও টলমল করা। শিরঃপীড়া মস্তকের সম্মুখে ও পশ্চাতে। একপার্শ্বিক মস্তিষ্করোগ। একপার্শ্বিক শিরঃশূল। এককালে মাথার একপার্শ্বে, মস্তিষ্কের এক অৰ্দ্ধাংশ জুড়িয়া তীব্র স্নায়ুশূল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিরঃপীড়া দক্ষিণদিকে উপস্থিত হয়—একপার্শ্বিক শিরঃপীড়া। যেসকল ভগ্নস্বাস্থ্য ব্যক্তি, যাহারা রৌদ্রে উন্মুক্ত থাকিয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম হইতে শয্যাশায়ী হইয়াছে। মস্তক-ত্বকে, কানে, শরীরের যেখানে সেখানে চুলকানিযুক্ত স্থান। বরফাঘাতের ন্যায় চুলকানি ও জ্বালা। ইহাতে পায়ের আঙ্গুলে, কানে ‘এগারিকাসের ন্যায় চুলকানি ও জ্বালা আছে; সে ঐ অঙ্গগুলি চুলকাইতে থাকে; যতক্ষণ না ছাল উঠিয়া যায় এবং রক্ত না পড়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত চুলকানির কোন উপশম হয় না। কানের ছাল উঠা অবস্থা, কিন্তু সে সৰ্ব্বদা কানে আঙ্গুল ঢুকায় ও চুলকায়। সুড়সুড় করা, চুলকানি এবং জ্বালার জন্য সে চুলকাইয়া ছাল তুলিয়া ফেলে।

চক্ষু সম্বন্ধে আর একটি অদ্ভুত লক্ষণ এই যে, লৌহ ধাতু চক্ষুর গোলক অপেক্ষা চক্ষুর পাতাকেই অধিক আক্রমণ করে। ইহা দৃষ্টিশক্তিতে দৃষ্টির অপরিচ্ছন্নতা, দৃষ্টিহীনতা উৎপন্ন করে, কিন্তু ইহা চক্ষুর পাতায় রস-প্রসেক করে এবং চক্ষুপাতায় ক্রমশঃ পুরু হইতে থাকে, যতক্ষণ না তাহারা উপস্থির ন্যায় কঠিন হইয়া পড়ে। শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীগুলি রসপ্রসেকযুক্ত এবং কঠিন হয়, চক্ষুর পাতা খোলা যায় না। তাহারা আক্ষেপিকভাবে বন্ধ হইতে পারে, বল প্রয়োগ করিয়া না টানিয়া ফাঁক করা যায় না। ইহা পুরু হওয়া ও রস-প্রসেকযুক্ত অক্ষিপুট-প্রদাহন প্রচুর স্রাব। এক্ষণে, আমি ইহাকে সর্দি সৃষ্টিকর দেহাংশ বলিয়া বর্ণনা করিলাম বলিয়া আরও বলিব যে, এই ঔষধে আমরা অসাড়ে শ্লৈষ্মিক স্রাবও দেখিতে পাই। সময়ে সময়ে ঘন ও হরিদ্রাবর্ণ হইলেও এ স্রাব অসাড়ে নির্গত হয়; ইহা শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীচয়ের একটি অসাড় অবস্থা। কিন্তু আর্জেন্টাম মেটের প্রকৃতিগত প্রধান স্রাব ধূসরবর্ণ, ঘন এবং দুচ্ছেদ্য শ্লেষ্মা। উহা ফুসফুস হইতে, বায়ুনলী হইতে, গলনালী হইতে, স্বরযন্ত্র হইতে ধূসরবর্ণ শ্লেষ্মা তুলে। যোনিপথ হইতে, মূত্রপথ হইতে, চক্ষু হইতে ধূসরবৰ্ণ স্রাব নির্গত করে। কেবলমাত্র কোন কোন ক্ষেত্রে ইহার স্রাব হরিদ্রাবর্ণ হয়। যখন কণ্ঠনলীতে বা চক্ষুর পাতা প্রভৃতিতে ক্ষত জন্মে তখনই মাত্র আমরা ঐ ক্ষত হইতে ঘন হরিদ্রাবর্ণ স্রাব পাই, কিন্তু মূত্রনলী ব্যতীত, ক্ষতযুক্ত শ্লৈষ্মিক ঝিল্লী হইতেও সাধারণতঃ ধূসরবর্ণ স্রাব দেখা যায়। ইহা পুরাতন প্রমেহ রোগীকে আরোগ্য করিয়াছে। যখন আমরা কোন ঔষধের সাধারণ প্রকৃতিটি পাই, তখন উহা দেহের প্রত্যেকটি অংশে প্রবেশ করিলে, কি আশা করা সম্ভব তাহা আমরা জানি। যদি আমরা সাধারণ প্রকৃতিটি না জানি, তাহা হইলে কি আশা করিব, তাহাও আমরা জানিতে পারি না। আর যদি আমরা শরীরের বিশেষ অংশে কোন বিসদৃশ অবস্থা পাই, তাহা হইলে মনে করি উহা একটি ব্যতিক্রম সাধারণ লক্ষণের অনুরূপ নহে। কিন্তু সর্বপ্রথমে আমাদিগকে বাছিয়া লইতে হইবে, সাধারণ লক্ষণ কি, কি আশা করিতে পারা যায়, ঔষধের প্রকৃতিতে কি আছে; তারপর যখন আমরা বিপরীত কিছু দেখি, আমরা বুঝিতে পারি যে, উহা বিসদৃশ, একটি বিশেষ লক্ষণ একটি ব্যতিক্রম। আর্জেন্টামের চুলকানির একটি বিশেষ প্রকৃতি আছে। “যতক্ষণ পর্যন্ত রক্তপাত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কানে চুলকানি।” আর এই চুলকানি কর্ণের সমস্ত বাহির অংশের এবং উহা কানের মধ্যেও প্রবেশ করে, সুতরাং যতক্ষণ না কান লাল হইয়া উঠে, ফুলিয়া উঠে এবং রক্ত পড়ে ততক্ষণ সে চুলকাইতে থাকে। কানের উপস্থিগুলি ফীত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডেলাযুক্ত এবং রস-প্রসেকযুক্ত। নাকের উপস্থিগুলিও রস-প্রসেকযুক্ত। যেসকল রোগীর অস্ত্রচিকিৎসা করা হয় এবং রোগী ভালভাবে নিঃশ্বাস লইতে পারিবে বলিয়া নাকের অভ্যন্তরের কিছুটা অংশ কাটিয়া বাদ দেওয়া হয়, আর্জেন্টাম মেট তাহাদিগের অনেককে ভাল করে। “নাকের অস্থিগুলির পুরু হইয়া উঠা, নাসাপথের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লী ও কৌশিক তন্তুসমূহের পুরু হওয়া ও নূতন করিয়া উৎপত্তি।” এরূপ অবস্থায় আর্জেন্টাম মেট প্রায়ই উপযোগী হয়। এই ঔষধের একটি নিশ্চিত ক্রিয়া আছে। রস-প্রসেক চলিতে থাকিলে স্থানটি পুরু ও কঠিন হইয়া পড়িতে থাকে এবং তারপর সন্ধিগুলিতে আমরা রক্তাম্বু দেখিতে পাই। দেহের সৰ্ব্বত্র, উপস্থির পচনের ঔষধগুলির মধ্যে ইহাকে একটি সর্বপ্রধান ঔষধ বলিয়া মনে করা প্রয়োজন। কিন্তু ঐ সঙ্গে আমি যেরূপ বর্ণনা করিয়াছি, রোগীর তদনুরূপ স্নায়বিক ও মানসিক লক্ষণগুলি থাকা প্রয়োজন। রোগীকে রুগ্ন, বিবর্ণ, চিন্তাক্লিষ্ট ও ক্লান্ত দেখায়। ভগ্নস্বাস্থ্য রোগী। আর্জেন্টাম মেটের রোগী এরূপ রুগ্ন যে, বহু বৎসর পূর্বেই তাহার একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের প্রয়োজন ছিল এবং যদি সে বহুদূর অগ্রসর হইয়া না থাকে, তাহা হইলে এখনও তাহাকে ঔষধ দ্বারা উপশম ও উপকার দেওয়া চলিতে পারে।

“গলায় যন্ত্রণাদায়ক টান-টানভাব এবং আকর্ষণ। নিঃশ্বাস ফেলিবার সময় গলায় হাজা এবং তবৎ বোধ হয়।” এইভাব কণ্ঠনলী পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত হয়। “নিঃশ্বাস লইতে কষ্টকর ক্ষতবৎ অনুভূতি। কাশিতে গেলে স্বরযন্ত্রে অবদরণবৎ বেদনা। অনায়াসে অনেকখানি করিয়া ধূসরবর্ণ শ্লেষ্মা উঠিয়া আসে। কণ্ঠদেশের ডানদিকে টান-টানভাব।”

আর্জেন্টাম মেটে উদরের উপদ্রব আছে। উদরে থেৎলানবৎ, ক্ষতবৎ অনুভূতি। যদি ইহা শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীগুলির সর্দিজ প্রদাহ হইতে বাড়িয়া উদরের সমস্ত তন্তুর সাধারণ রক্তসঞ্চয়ে দাঁড়ায়, তাহা হইলে উদরাময় দেখা দেয় অথবা অত্যন্ত দুর্দম্য প্রকৃতির কোষ্ঠবদ্ধ জন্মে; মধ্যান্ত্রত্বকের গ্রন্থিগুলির যক্ষ্মা রোগ; শীর্ণতা দুৰ্বলতা এবং কম্পন দেখা দেয়। শরীরের যেখানে-সেখানে। পক্ষাঘাতবৎ অনুভূতি। মূত্র সম্বন্ধীয় উপদ্রবের সহিত সম্বন্ধযুক্ত সমস্ত উদরে কষ্টকর ক্ষতবৎ বেদনা। ইহাতে দুষ্ট জাতীয় তন্তু নির্মাণ আছে। আমি পূৰ্ব্বে যেরূপ বলিয়াছি, দ্রুপ গুটিকারোগ; কর্কটরোগ, রস-প্রসেক। বালির ন্যায় শুষ্ক মল। অজীর্ণ মল, অতি দুর্গন্ধ। মূত্রপথের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর সর্দিজ প্রদাহ, সমগ্র মূত্রপথের প্রদাহ। ইহা দ্বারা অন্ডলাল মূত্র আরোগ্য হয়, ইহা দ্বারা শর্করাযুক্ত বহুমূত্ররোগ আরোগ্য হয় এবং মূত্রপিন্ডের অনেক প্রকার ভগ্ন অবস্থা আরোগ্য হয়। অবসন্ন ভগ্নস্বাস্থ্য ধাতু। অনেকখানি করিয়া ছানার জলের ন্যায় মূত্র। প্রচুর মূত্রপাত।

শিশুদিগের নিদ্রার মধ্যে মূত্রস্রাব হয়। ভগ্নস্বাস্থ্য স্নায়বিক ধাতুর লোকেরা নিদ্রিতাবস্থায় মূত্র ত্যাগ করে।

স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়ের জননেন্দ্রিয়ের উপর ইহার নিশ্চিত ক্রিয়া আছে। পুরুষদের পক্ষে ইহা বিশেষতঃ অন্ড ও শ্লৈষ্মিক পথ আক্রমণ করে। ইহা অন্ডে রস-প্রসেক করিয়া উহার কঠিনতা উৎপাদন করে। পাঠ্যপুস্তকে বলা হইয়াছে, “দক্ষিণ অন্ডে পিষ্ঠবৎ বেদনা।” “চলিবার সময় কাপড় লাগিয়া যন্ত্রণা বর্ধিত হয়। রসপ্রসেকহেতু প্রদাহ। পুরাতন অন্ডকোষ প্রদাহ রোগ। গণোরিয়ার পরবর্তী অন্ডকোষের উপকোষে আরম্ভ হইয়াছে এরূপ কর্কটরোগের সন্দেহযুক্ত অন্ডকোষ পীড়া ইহা দ্বারা আরোগ্য হইয়াছে । প্রদাহ, অতিশয় কাঠিন্য, বেদনা, স্ফীতি, জ্বালা এবং হুলবিদ্ধবৎ বেদনা।

এখানে আর একটি লক্ষণ অত্যন্ত মূল্যবান। “প্রারম্ভকাল হইতে আট মাস স্থায়ী অলস প্রকৃতির হরিদ্রাভ সবুজ গণোরিয়া স্রাব।” রোগী চিকিৎসায় এই লক্ষণটি প্রতিপন্ন হইয়াছে। এখন গণোরিয়ার সাধারণ প্রকৃতি এই যে, গোড়ার দিকে স্রাবটি হলদে অথবা হরিদ্রাভ সবুজ এবং গাঢ় থাকে, তারপর ক্রমশঃ উহা ফিকে হইতে থাকে, ক্রমে সাদাটে ঘন অথবা পাতলা হয়; এবং তারপর আরও পাতলা হইয়া সাদা এবং লালমেহের ন্যায় হয়। স্রাবটি বরাবর হলদে রহিয়া গেলে আর্জেন্টাম মেটই তাহার ঔষধ। গণোরিয়ার সকল যন্ত্রণাই শেষের দিকে থামিয়া যায় এবং যন্ত্রণা থামিয়া গেলে স্রাবটি ফিকে হইতে থাকে, কিন্তু আর্জেন্টাম মেটের রোগীর যন্ত্রণা থামিয়া গেলে স্রাব অসাড়ে হইতে থাকে, মূত্রনলী যন্ত্রণার অনুভূতি হারায় এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর যন্ত্রণাবোধ বহুল পরিমাণে নষ্ট হইয়া যায়, কিন্তু ঘন সবুজাভ অথবা হরিদ্রাভ স্রাবটি থাকিয়াই যায়। আর এইরূপ পুরাতন রোগীর যখন ঘন অসাড়ে স্রাবটি দীর্ঘকাল ধরিয়া চলিতে থাকে, তখন আমাদের পক্ষে ঔষধটি খুঁজিয়া পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়। রোগটি আরও দুর্দম্য হয় যদি স্রাবটি তখনও হরিদ্রাবর্ণ থাকে, তখনও ঘন থাকে। এরূপ রোগী সাধারণ ঔষধে আরোগ্য হয় না, তাহাদের জন্য বিশেষ প্রকারের ঔষধ চাই—আর্জেন্টাম মেট, এলুমিনা’ এলুমেন’, ‘সালফার। এই সকল ঔষধ সম্বন্ধে রোগের প্রথম দিকে চিন্তা করা সাধারণতঃ প্রয়োজন হয় না, কিন্তু রোগীর সাধারণ ধাতুগত অবস্থাই উহার প্রয়োগ লক্ষণগুলি নির্ণয় করিয়া দেয়।

স্ত্রীলোকদিগের সম্বন্ধে আমরা পাই ডিম্বকোষের উপদ্রব, রস-প্রসেক, কঠিনতা, কৌষিক উপদ্রব; ডিম্বকোষে কৌষিক সংগঠন, এইগুলি এই ঔষধে আরোগ্য হয়। ডিম্বকোষের অর্বুদ; অতিবৃহৎ, কঠিন, রস-প্রসেক যুক্ত ডিম্বকোষ; বিশেষতঃ বামদিকেরটি। ডান অন্ডকোষ এবং বাম ডিম্বকোষ। বাম ডিম্বকোষ এবং পৃষ্ঠে বেদনা। বাম ডিম্বকোষে বেদনার সহিত জরায়ুর বহির্নির্গমন। বসিয়া থাকাকালে পৃষ্ঠের নিম্ন অংশে বেদনা। ইহা দ্বারা বাম ডিম্বকোষের রোগই সমধিক আরোগ্য হইয়াছে, যদিও ইহা উভয় ডিম্বকোষের রোগই আরোগ্য করিতে পারে।

এই ঔষধের অপর একটি প্রবল প্রকৃতি দেখা যায় উহা দেহের সমুদয় পেশীর দুর্বলতা এবং শিথিলতা, কম্পন; এক্ষণে যদি এই চিন্তা আরোপ করিয়া বস্তিগহ্বরের যন্ত্রগুলির উপর এই ঔষধের ক্রিয়া লক্ষ করা যায়, তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, যে-সকল পেশী জরায়ুকে ধারণ করিয়া আছে, সেই প্রশস্ত বন্ধনীটি শিথিল হইয়া পড়িয়াছে, উহারা জরায়ুকে ঝুলিয়া পড়িতে দিয়াছে। অন্য কথায় আমরা জরায়ুর বহির্নির্গমন পাইলাম। তোমরা জানিলে বিস্মিত হইবে যে, হোমিওপ্যাথিক ঔষধগুলি অদ্ভুতভাবে স্থিতিস্থাপকতা গুণের প্রতিষ্ঠা করিতে পারে এবং তদ্বারা বহির্গত জরায়ুকে তাহার স্বাভাবিক স্থানে ফিরাইয়া আনিতে পারে এবং স্ত্রীলোকগণ যে বলে,

“ঝুলিয়া পড়া ভাব অর্থাৎ ভিতরের যন্ত্রগুলি জোরে বাহির হইয়া পড়িতেছে এরূপ অনুভূতি দূর করিতে পারে। এগুলি সবই জরায়ু নির্গমনের আনুষঙ্গিত লক্ষণ। আর্জেন্টাম এইরূপ ঔষধগুলির একটি। বস্তুতঃ সমগ্র বস্তিগহ্বর প্রণালী রক্তে অতিপূর্ণ হইয়া উঠে, উহা ওজনে বর্ধিত হয়, রসপ্রসেকযুক্ত তন্তুগুলি শক্ত হইয়া উঠে। জরায়ুগ্রীবা রক্তসঞ্চয়যুক্ত ও স্ফীত হয়। উহাতে ক্ষত জন্মে। উহা রক্তসঞ্চয়হেতু অত্যন্ত বর্ধিত হয়। জরায়ুগ্রীবার কর্কটরোগে জ্বালা, হুলবিদ্ধবৎ বেদনা, প্রচুর দুর্গন্ধ হরিদ্রাভ সবুজ এবং রক্তাক্ত স্রাব থাকিলে, ইহা একটি উপশমদায়ক ঔষধ হইয়াছে। ইহা অতিরজঃ, প্রচুর ঋতুস্রাব প্রবণতা আরোগ্য করিয়াছে; সাধারণ লক্ষণগুলি বর্তমান থাকিলে এবং লক্ষণ মিলিলে ইহা রক্তস্রাবের ক্ষেত্রে যে শিথিলতা অবশ্যই বর্তমান থাকে, তাহা দ্রুত দমন করিতে পারে। জরায়ুর ক্ষত, উহা হইতে পুঁজময় রসানির ন্যায় স্রাব। “সময়ে সময়ে অসহ্য দুর্গন্ধযুক্ত রক্তাক্ত জল।” টিসুসমূহ রস-প্রসেকযুক্ত হইয়া দৃঢ় হইতে চলিলে এবং ওজনে বাড়িলে, ইহা তাহার ঔষধ। “গ্রীবাদেশ অর্থাৎ জরায়ুগ্রীবা অত্যন্ত স্ফীত, স্পঞ্জের ন্যায়, পিন্ডের মত; চারিদিকে ক্ষতের দ্বারা গভীরভাবে ক্ষয়িত।” কোন একটি জরায়ু-কর্কট রোগীকে এই ঔষধ দেওয়া হইলে জানা গিয়াছিল যে, “তিন দিনেরও কম সময়ে দুর্গন্ধ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হইয়াছিল।” কোন ঔষধ যখন এরূপ কাৰ্য্য করে, তখন ইহা নিশ্চয়ই রোগের প্রসার নিবারণ করে। বাস্তবিক কর্কটরোগজ অবস্থার শেষ পরিণতি চৌদ্দ বা ষোল মাসের মধ্যেই আসে, কিন্তু ইহা দ্বারা ঐ অবস্থা দুই তিন বৎসর স্থায়ী হইয়াও রোগীকে বেশ স্বচ্ছন্দেই রাখে। লক্ষণ সাদৃশ্যে প্রযুক্ত ক্ষত নিবারণ করে, ধ্বংস রোধ করে এবং রোগীকে বহু বৎসর যাবৎ স্বাচ্ছন্দ্যে রাখে এবং বন্ধুগণের মধ্যে বাস করিবার সুযোগ দেয়। কর্কটরোগে জীবনের অবস্থা অত্যন্ত অবসন্ন থাকে। ঐরূপে অবস্থার পুনর্গঠন সাধারণতঃ সম্ভব হয় না।

অতঃপর আমরা কণ্ঠনলীর কথা বলিব। ইহা কণ্ঠনলীর পক্ষে একটি আশ্চর্য্য ঔষধ। গায়ক ও বক্তাদিগের যেরূপ হয়, সেইরূপ স্বরের অতিচালনাহেতু স্বরনাশ ও তৎসহ প্রদাহ। যাহারা অতিশয় স্বরযন্ত্রের চালনা করিতে বাধ্য হন তাঁহাদের পীড়া। ইহা তখন বাকতন্ত্রীর পক্ষাঘাতিক দুর্বলতা। এই ঔষধের সর্বত্র যে-কোন প্রকার সামান্য অথচ দীর্ঘকালস্থায়ী পরিশ্রমে বৃদ্ধি এবং পরিশ্রমে বৃদ্ধি লক্ষণযুক্ত পক্ষাঘাতিক দুর্বলতা আছে। ফুসফুসে, শরীরের প্রত্যেক যন্ত্রের এইরূপ লক্ষণ দেখা যায়। তারপর আসিতেছে স্বরনাশের কথা। এইবার আমরা ইহার রসপ্রসেক ক্ষমতা সম্বন্ধে যাহা জানি, তাহা প্রয়োগ কর। আমরা পাইতেছি কণ্ঠনলীর যক্ষ্মারোগ। যে-সকল গায়ক এবং বক্তা ভগ্নস্বাস্থ্য, স্নায়বিক দুর্বল হজম শক্তি বিশিষ্ট এবং পূর্বপুরুষের খারাপ রোগের উত্তরাধিকারী, তাহারা কণ্ঠনলীর ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয় এবং স্বর নষ্ট হইয়া যায়। তারপর ক্ষত দেখা দেয়। এই সমুদয় উপদ্রব অবশেষে ফুসফুসে পৌঁছে। তাহারা শীর্ণ হইতে থাকে নিশা-ঘৰ্ম্ম দেখা দেয়। “স্বরনাশ” সাধারণতঃ যন্ত্রণাদায়ক প্রকৃতির।

তারপর, সর্দি কণ্ঠনলীতে বসে। “উচ্চ স্বরে একটি কথাও বলিতে পারে না, কণ্ঠনলীতে অবিরত সুড়সুড়িতে কাশি উদ্ৰিক্ত হয়।” কণ্ঠনলীর উপর অংশে হাজা বোধ এবং ক্ষতবৎ বেদনা। হাসিলে কাশি বাড়ে, হাসিলে গলায় সুড়সুড়ি দেখা দেয় এবং সে গলা খেঁকারি দিয়া অনেকখানি ধূসরবর্ণ শ্লেষ্মা তুলে। যদি ফুসফুসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুপথে উত্তেজনা থাকে, তাহা হইলে কাশি আরম্ভ হয় এবং সে গলা খেঁকারি দিয়া ধূসর বর্ণ শ্লেষ্মা তুলে। “স্বরযন্ত্র ব্যবহার কালে, গল্প বা গান করিবার বা হাসিবার সময় শ্বাসনলীর দ্বিশাখা স্থানে একটি হাজাযুক্ত স্থান থাকার অনুভূতি।” বক্ষের মাঝখানে হাজা বোধ। “স্বরের কর্কশতা এবং স্বরভঙ্গ, স্বরযন্ত্রের যক্ষ্মারোগ”-শীর্ণ যুবকদিগের যে যুবকদিগের বয়স পঁচিশ বৎসরের অধিক নয় কিন্তু দেখিতে পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধের মত। বহু দুশ্চিন্তায় যেন তাহার কপালটি কুঁচকাইয়া গিয়াছে। তাহার শুষ্ক কাশি থাকে, সামান্য ধূসরবর্ণ শ্লেষ্মা তুলে। কিন্তু তথাপি সে যেন তার দিয়া গড়া (সহজে ভাঙ্গিয়া পড়ে না), সে বেশ কাজ করিয়া যায়। সে বংশগত যক্ষ্মার অধিকারী। তাহার কাশি গভীর প্রকৃতির; হাসিলে, কথা কহিলে এবং গরম ঘরে গেলে বৰ্দ্ধিত হয়। হাসিলে কাশি উৎপন্ন হয় এবং কণ্ঠনলীতে শ্লেষ্মা উৎপন্ন হয়। এই ঔষধ যক্ষ্মা সম্ভাবনা এবং বিরক্তিকর কাশি দূর করিবে। সামান্য শুষ্ক খুকখুকে কাশিও বিশেষভাবে এই ঔষধের অধিকারে আসে। ব্রায়োনিয়ায় আমরা যেরূপ ভীষণ, আক্ষেপিক; কম্পনকর কাশি দেখি, সেরূপ কাশি আমরা কখনও ইহাতে পাইব না। কাশিবার সময় কণ্ঠনলীতে একপ্রকার ক্ষতবৎ অনুভূতি থাকে। “কাশির সহিত সহজে সর্দি উঠার সংযোগ থাকে।”সে গলার সামান্য উত্তেজনার জন্য যত কাশে, শ্লেষ্মা তুলিয়া ফেলিবার জন্য তত কাশে না; কিন্তু শ্লেষ্মা জমিলে তাহা সহজেই উঠিয়া আসে। আমরা অনেক ঔষধে যেরূপ দেখি, ইহাতে কাশি তুলিয়া ফেলা সেরূপ কষ্টকর নয়। “কণ্ঠনলীতে সহজে উৎক্ষিপ্ত হয় এরূপ শ্লেষ্মা।” সে কণ্ঠনালীতে একবার খেঁকারি দিয়াই উহা তুলিয়া ফেলে। দিবাভাগে এবং সন্ধ্যাকালে কাশি ও গলায় খেঁকারি দেওয়া, গরম ঘরে উহার বৃদ্ধি; খোলা বাতাসে এবং চলাফেরায় উপশম।

ইহাতে বুকে দুর্বলতা বোধ আছে। এরূপ বুকের দুর্বলতার দুইটি মাত্র ঔষধ আছে এবং তুমি সহজেই উহাদিগকে পৃথক করিতে পারিবে না দুৰ্বল কণ্ঠস্বর, দুৰ্বল বক্ষ, শ্বাস-প্রশ্বাস যেন কষ্টদায়ক—এরূপ অনুভূতি, কথা বলিতে অত্যন্ত কষ্ট, কাশিতে অত্যন্ত কষ্ট, কারণ বুকের পেশীগুলি দুৰ্বল বোধ হয়। এই ঔষধ দুইটি-আর্জেন্টাম মেট এবং ষ্ট্যানাম। বক্ষের পেশীগুলির অত্যধিক দুর্বলতা। রোগী এই সম্বন্ধে অত্যন্ত চিন্তা করে; এবং যক্ষ্মারোগে যেরূপ দেখা যায়, এই দুৰ্বলতা তাহা অপেক্ষা অনেক বেশী হয় । ইহা বুকের পৈশিক দুৰ্বলতা সম্বন্ধে বিশেষ অনুভূতি। বক্ষের একপ্রকার পক্ষঘাতিক দুর্বলতা। অবশ্য, ‘এন্টিমোনিয়াম টার্টে যে প্রকার ভয়ানক বুকের দুর্বলতা আছে ইহা তাহা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। মনে রাখিও যে, ‘এন্টিম টার্টের ঐ অবস্থা তরুণ রোগে দেখা দেয়। আর্জেন্টাম মেট দীর্ঘদিন স্থায়ী রোগে উপযোগী, ইহার রোগ অনেক দিন ধরিয়া চলিতে থাকে, সুতরাং আমি পূর্বে যাহা বলিয়াছি “এই বুকের অত্যন্ত দুর্বলতা” তাহাই এবং ইহা এরূপ যে, রোগী তাহা প্রকাশ করিয়া বলিতে পারে না, শুধু বলে “ডাক্তার, আমি বুকের মধ্যে দুৰ্বল বোধ করিতেছি।”

অতঃপর এই ঔষধে যথেষ্ট হৃৎপিন্ড সম্বন্ধীয় উপদ্রব আছে। চিৎ হইয়া শুইলে বুক ধড়ফড়ানি। “বুকের মধ্যে একপ্রকার কম্পন বোধ।” বিভিন্ন রোগী এই বুকের মধ্যের কম্পনকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করিবে, যথা—উঠাপড়া করা, পতপত করা, থরথর করা। এই ঔষধের একটি প্রবল লক্ষণ—সর্বাঙ্গে, হাতে, পায়ে কম্পনশীল দুৰ্বলতা, বুকে ধড়ফড়ানির সহিত সৰ্বাঙ্গীণ কম্পন, “পুনঃ পুনঃ বুকে ধড়ফড়ানি, গর্ভাবস্থায় বুক ধড়ফড়ানি, রাত্রিকালে বুক ধড়ফড়ানি, বুক ধড়ফড়ানির সহিত সম্বন্ধযুক্ত শিরঃপীড়া।” ইহার সহিত সৰ্বাঙ্গীন দুৰ্বলতা, ক্রমবর্ধমান দুৰ্বলতা। বুক ধড়ফড়ানি এবং দুর্বলতার জন্য হাঁটু দুইটি কাঁপিতে থাকে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি আড়ষ্ট হইয়া যায়। “অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবশতা, যেন এগুলি সম্পূর্ণ নিদ্রিত হইয়া পড়িয়াছে।” শক্তি নাশ। অধিকাংশ লক্ষণই বিশ্রামকালে বর্ধিত হয়। বসিয়া থাকিলে পৃষ্ঠে ও অন্যান্য অঙ্গে বেদনা, চলিয়া বেড়াইলে উহার উপশম। ঔষধসমূহের মধ্যে যত প্রকার স্নায়বিক উত্তেজনা থাকা সম্ভব, তাহার সবই এই ঔষধটিতে আছে।

About The Author

M.D (AMCC, Kolkata, India) M.M (B.M.E.B) D.H.M.S (B.H.B)

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!